প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভোজ্যতেলে দেশের আমদানির ওপর নির্ভরতা এখনও বিদ্যমান। মার্কিন কৃষি বিভাগের (USDA) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিবছর প্রায় ৩৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের প্রয়োজন হয়। দেশের উৎপাদিত তেলবীজ থেকে প্রাপ্ত তেল মোট চাহিদার আনুমানিক ১৫ শতাংশ পূরণ করে। বাকি অংশ আসে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল (ক্রুড) অথবা তেলবীজ থেকে।
এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে, দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার কৃষিজমি, পতিত জমি এবং নদীর চরাঞ্চলে সরিষা, তিল, তিসি, বাদাম, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য তেলবীজের আবাদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আমন ও বোরোর মাঝের স্বল্পমেয়াদি সময়ে তেলবীজ চাষ বৃদ্ধি পেলে একই জমিতে বহুমুখি ফসল উৎপাদন সম্ভব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) কৃষি শুমারি-২০১৯ অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে তেলবীজ আবাদে ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ২২ একর, যা প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৪৪ হেক্টরের সমান। রংপুর বিভাগে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৭৯ একর, বা প্রায় ৫০ হাজার ৭৯৯ হেক্টর। দুই বিভাগ মিলিয়ে তেলবীজের আওতায় ছিল প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার ৩৪৩ হেক্টর জমি।
তেলবীজ আবাদে দুই বিভাগের মধ্যে রাজশাহী এগিয়ে রয়েছে। ২০২২-২৩ সালে দেশের মোট তেলবীজ উৎপাদন ছিল প্রায় ৭ লাখ ৬৮ হাজার টন; এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগ একাই প্রায় ৩ লাখ ২ হাজার টন উৎপাদন করে দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে শীর্ষে ছিল। একই বছরে রংপুর বিভাগের উৎপাদন ছিল প্রায় ৬৯ হাজার টন।
জেলা পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি শুমারির হিসাবে সিরাজগঞ্জে তেলবীজ আবাদি জমির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি—১ লাখ ২৮ হাজার ১৬৯ একর। এরপর নওগাঁয় ৫১ হাজার ১ একর, পঞ্চগড়ে ৪৮ হাজার ১৯৪ একর এবং পাবনায় ৪৭ হাজার ১৩১ একর জমিতে তেলবীজ আবাদ ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তেলবীজ চাষে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে সরিষায়। ২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৬ লাখ ৪৬ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের চার জেলায় ১ লাখ ৮২ হাজার হেক্টর এবং বগুড়া কৃষি অঞ্চলের চার জেলায় ২ লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে।
রংপুর বিভাগেও সরিষার আবাদ দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বিভাগের আট জেলায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমিতে সরিষার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় শেষ পর্যন্ত ৭৮ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ২৭৫ টন।
সূর্যমুখীও উত্তরাঞ্চলে পরীক্ষিত সম্ভাবনাময় ফসল। রংপুর অঞ্চলে ২০২৪ সালে ২২১ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী আবাদ হয়েছিল। কুড়িগ্রামে ১০৮, গাইবান্ধায় ৬৯, রংপুরে ৪৩ এবং নীলফামারীতে ১ হেক্টর জমিতে এ আবাদ হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো নদীর চরাঞ্চল। রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর চর ও নদীর তলদেশে প্রতিবছর বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হচ্ছে। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনাসহ বিভিন্ন নদীর চরাঞ্চলে সরিষা, তিল, তিসি, বাদাম ও সূর্যমুখীসহ নানা ফসলের চাষ হচ্ছে।
অন্যদিকে পদ্মা-যমুনার চরাঞ্চলেও সরিষা ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানাচ্ছে, রাজশাহী অঞ্চলের পদ্মা অববাহিকার বালুচরে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকরাও সরিষা চাষে যুক্ত হয়েছেন।
তবে সয়াবিনের ক্ষেত্রে উত্তরাঞ্চলের চরকে এখনও বড় বাণিজ্যিক উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে দেখা হচ্ছে না। দেশে উৎপাদিত সয়াবিনের বড় অংশ তেল উৎপাদনের পরিবর্তে পশুখাদ্য শিল্পে ব্যবহৃত হয় এবং ভোজ্য সয়াবিন তেলের জন্য আমদানিকৃত সয়াবিন ও অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে পদ্মা-যমুনা-তিস্তা-ধরলার চরে সয়াবিনের সম্ভাবনা যাচাই করতে অঞ্চলভিত্তিক জাত, বপনকাল, লবণাক্ততা/জলাবদ্ধতা, বাজার ও তেল নিষ্কাশন সুবিধা নিয়ে পরীক্ষামূলক সম্প্রসারণের প্রয়োজন।
দেশে ভোজ্যতেলের ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। USDA-এর হিসাবে মোট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ পাম, ২৮ শতাংশ সয়াবিন, ১৯ শতাংশ সরিষা এবং ৩ শতাংশ অন্যান্য তেল। আর ২০২১ সালের একটি গবেষণায় পাম ৫১ শতাংশ, সয়াবিন ৪৩ শতাংশ এবং সরিষা ৫ শতাংশ ব্যবহারের হিসাব পাওয়া যায়—অর্থাৎ উৎস ও বছরভেদে বাজারের হিসাব কিছুটা পরিবর্তিত হয়।
জাতীয় পর্যায়ে ৩৪ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদাকে জনসংখ্যার অনুপাতে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রায় ২১-২২ শতাংশ জনসংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলে এ অঞ্চলের সম্ভাব্য বার্ষিক চাহিদা আনুমানিক ৭-৭.৫ লাখ টন হতে পারে। এটি সরকারি অঞ্চলভিত্তিক চাহিদার হিসাব নয়, জাতীয় চাহিদা থেকে করা একটি আনুমানিক হিসাব।
অতএব, উত্তরাঞ্চলের পতিত জমি, আমন কাটার পরের জমি এবং পদ্মা-যমুনা-তিস্তা-ধরলার চরকে পরিকল্পিতভাবে তেলবীজ উৎপাদনে যুক্ত করা গেলে দেশে সরিষা ও সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তেল নিষ্কাশন কারখানা, সংগ্রহ ও সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে তেলবীজ উৎপাদন শুধু আমদানি নির্ভরতা কমাবে না, বরং উত্তরাঞ্চলের কৃষকের জন্য নতুন আয়ের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে
বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন