প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আরথিক সংকটের কারণে সরকারি কর্মচারীদের নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন এই পে স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সম্প্রতি সংস্থাটির একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরকালে অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকের সময় এই পরামর্শ দেয়। তবে সরকার সংস্থাটির প্রস্তাব আমলে নিচ্ছে না। এজন্য সরকার আগামী অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগেই পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ করতে চায়।
অন্যদিকে, আইএমএফ চায় এটিকে অক্টোবর পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখতে। তাহলে অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বার্ষিক সভায় এ বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি নভেম্বরে একটি টিম বাংলাদেশ সফরে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও পে স্কেল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে চাইছে। তবে সরকার আইএমএফকে সেই সুযোগ দিতে চায় না। এজন্য অক্টোবরের আগেই পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ করে বাস্তবায়ন করতে চায়। অর্থ বিভাগের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে নতুন পে স্কেলের প্রস্তাবনা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্থ বিভাগ। চলতি সপ্তাহের শেষ অথবা আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে এর সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এর অংশ হিসেবে পে স্কেলের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে পে স্কেলের প্রস্তাবনা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও পে স্কেল সংক্রান্ত ফোকাল পারসনসহ আরো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। এ সময় পে স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার নানা দিক তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। পরে প্রধানমন্ত্রী বাস্তবায়নের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখান থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে আরও ভাবতে বলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব, বাজেট ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। সেখানে আইএমএফের আপত্তির বিষয়গুলো সম্পর্কেও আলোচনা হয়েছে। চলতি বাজেটে নতুন পে স্কেলের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে সেটি অপ্রতুল কি না তাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে বৈঠকে।
এর আগে বর্তমানে প্রচলিত অষ্টম পে স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসেনি। এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং নিত্যপণ্যের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জোরালো হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, সরকারের অধীনে কর্মরত প্রায় ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী নতুন পে স্কেলের আওতায় আসবেন। বেতন বাড়ার সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে পেনশন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সংগঠন মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ, মহার্ঘ ভাতা সমন্বয় এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন বেতন কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি এবং সরকারি রাজস্ব সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে বেতন কাঠামো নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। এদিকে বাংলাদেশ বর্তমানে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এরই মধ্যে নতুন সাড়ে ছয় বিলিয়ন ডলার ঋণ কর্মসূচির আলোচনা শুরু হয়েছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন সরকারী বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের ওপর বেশি চাপ তৈরি করবে। এ কারণে সংস্থাটি নতুন পে স্কেল কার্যকর করার সিদ্ধান্ত অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় অন্তত ৮২ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যেতে পারে। বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে পেনশন, উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধাও বৃদ্ধি পাবে, ফলে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
বর্তমান অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে ব্যয়ে হচ্ছে। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় অধিক দক্ষতা প্রয়োজন হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় কমে গেছে। মূল্যস্ফীতির ফলে ক্রয়ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, মেধাবী জনবল আকর্ষণ ও কর্মীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য নতুন পে স্কেল প্রয়োজন।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগ বিকল্প কয়েকটি মডেল নিয়েও কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট গ্রেডে অগ্রাধিকারভিত্তিক সুবিধা এবং কয়েক ধাপে আর্থিক প্রভাব সমন্বয়ের পরিকল্পনা। এই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করলে এককালীন আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে বলেও মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে, অন্যদিকে আইএমএফের সঙ্গে চলমান সংস্কার কর্মসূচির ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে।
সবকিছু যদি ঠিক থাকে, তাহলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। অনুমোদন মিললে অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগে নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের পথ আরও উন্মুক্ত হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন