প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ একটি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, যা দেশটির থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইরাক যুদ্ধের পর এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেল আয়কে ঋণদাতাদের দাবির হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে অর্থায়ন করা।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই ব্যবস্থা ইরাকের জন্য নির্ভরতার একটি রূপ নিয়ে এসেছে। কারণ, দেশটির তেল থেকে আয় হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ মার্কিন ডলারে আসে। এই অর্থ নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের মাধ্যমে ইরাকে পৌঁছায়। ফলে ইরাকের নিজস্ব অর্থে প্রবেশাধিকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।
ইরান এবং ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে এই আর্থিক ব্যবস্থাকে কাজে লাগাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এপ্রিল মাসে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে ইরাক সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের সময় ওয়াশিংটন প্রায় ৫০ কোটি ডলারের নগদ অর্থ ইরাকে পাঠানো আটকে দেয়। পরে অবশ্য অর্থ পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
তৎকালীন পার্লামেন্টের অর্থ কমিটির সদস্য মুয়ায়েন আল-কাধিমি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তিনি মার্কিন নিয়ন্ত্রণকে দেশের আর্থিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরাক কেন অর্থ অন্য দেশে সরিয়ে নেয় না, এই প্রশ্নের উত্তর হলো, ইরাকের তেল মূলত মার্কিন ডলারে মূল্য নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানির ক্ষেত্রেও দেশটি ডলারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
এছাড়া, ইরাকের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে। ফলে বর্তমান ব্যবস্থা থেকে অর্থ সরিয়ে নিলে বিভিন্ন ঋণদাতার দাবির মুখে ইরাকের সম্পদ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব বসরার অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ সাদ্দামের মতে, নিউইয়র্কে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব রাখার বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে।
তিনি বলেন, এর অন্যতম সুবিধা হলো সাবেক সরকারের ঋণদাতাদের কাছ থেকে ইরাকের তেল থেকে আয়কে সুরক্ষা দেওয়া। এছাড়া, এই হিসাব তেল বিক্রি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধ সহজ করে এবং অর্থ স্থানান্তরের খরচ কমায়। আন্তর্জাতিক লেনদেনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মুদ্রা হওয়ায় ডলারের ব্যবহারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সাদ্দামের মতে, এই ব্যবস্থার কারণে ইরাক মার্কিন চাপের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
ডলার থেকে বের হওয়ার পথ কতটা সহজ, এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, ইরাক চাইলে ইউরো বা চীনা ইউয়ানে তেল বিক্রি করতে পারে, যদি তেল বিক্রির চুক্তিতে ডলারে লেনদেনের বাধ্যবাধকতা না থাকে। তবে এতে ডলারের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি শেষ হবে না।
সাদ্দাম বলেন, তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের সঙ্গে যুক্ত থাকায় অন্য মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করলেও শেষ পর্যন্ত ডলারের বিনিময় হার ধরেই হিসাব করতে হবে।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশের জন্য ইরাকের ডলার প্রয়োজন হবে। অন্য মুদ্রায় দ্রুত স্থানান্তর করলে বিনিময় হারের কারণে আর্থিক ক্ষতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে একাধিক সার্বভৌম হিসাব খোলা যেতে পারে। পাশাপাশি নিউইয়র্কের বর্তমান হিসাবও রাখা যেতে পারে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হিসাব খোলার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ইরানকে ঘিরে আর্থিক চাপ
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং ইরাকে তেহরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করার মার্কিন প্রচেষ্টা জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরাকের এই আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বও বেড়েছে।
ইরাকের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির ভেতরেও বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরাকের কিছু ব্যাংক, মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক নেটওয়ার্ক দেশটির আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ডলার স্থানান্তর করছে।
ফলে ইরাকের তেল আয়ের অর্থ কোথায় রাখা হবে এবং কীভাবে তা আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহার করা হবে—এটি এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; বরং ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: এনডিটিভি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন