প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল: ৯ জুন ২০২৬: সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচি, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ, মানবাধিকারকর্মীদের মাঠ রক্ষার দাবি এবং মেলা আয়োজকদের আইনি তৎপরতা-সব মিলিয়ে বরিশাল বাণিজ্য মেলা এখন নগরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বরিশালের ঐতিহ্যবাহী পরেশ সাগর মাঠ যা কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ এবং জিলা স্কুলের মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয় রক্ষায় হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পর চরম নাটকীয়তার মোড় নিয়েছে বরিশাল বাণিজ্য মেলা। মেলা আয়োজনকে কেন্দ্র করে বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও আয়োজকদের নানা কৌশল এবং আইনি দৌড়ঝাঁপ এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।
আজ সুপ্রিম কোর্টের আদালত প্রাঙ্গণে বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এবাদুল হক চানকে আইনি সুরক্ষার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে দেখা গেছে। অথচ এর আগে বরিশাল প্রেসক্লাবে বসে সাংবাদিকদের সামনে তিনি জোর গলায় দাবি করেছিলেন-হাইকোর্টে মেলার বিরুদ্ধে কোনো মামলাই হয়নি। তাঁর সেই বক্তব্য যে কেবলই ‘ফাঁকা বুলি’ ছিল, তা এখন স্পষ্ট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মেলার বিরুদ্ধে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার পর থেকেই আয়োজক কমিটি বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। হাইকোর্ট বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করা হয়। প্রথমে বন্ধের দিনে স্থানীয় সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান সরোয়ারকে দিয়ে মেলা উদ্বোধন করার চেষ্টা চালানো হলেও তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে দিয়ে বরিশাল বাণিজ্য মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করায় চেম্বার অব কমার্স।
ঈদের ছুটির পর হাইকোর্ট বিভাগ খোলা হলে মামলাটির আইনি কার্যক্রমে নতুন গতি আসে। আদালতের নির্দেশনার পর চেম্বারের সভাপতি এবাদুল হক চান হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার আদেশের বিরুদ্ধে চেম্বার আদালতে আপিল আবেদন করেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, এই আপিল আবেদনের মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন যে বিতর্কিত মেলার মাঠটি পরেশ সাগর মাঠ হিসেবে পরিচিত এবং এটি কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও জেলা স্কুলের মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান ভিন্ন হতে পারে।
এদিকে, বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন থাকায় মাঠটির মালিকানা, পরিচয় ও ব্যবহারসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটি’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রনি সিকদার। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “সত্য কখনো চাপা থাকে না। এতদিন বরিশালের মিডিয়া অঙ্গনকে বিভ্রান্ত করে এবং সত্য আড়াল করে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, আদালতের চলমান আইনি প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলো এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আমরা আশা করি, চেম্বার আদালত বিষয়টি আইন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বিবেচনা করবেন।”
তিনি আরও বলেন, “ঐতিহ্যবাহী এই স্কুল মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।”
এদিকে, শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ ও পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে মেলাটি অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা হবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে চেম্বার আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন বরিশালের অনেক সচেতন নাগরিক।
সরকারের পরিপত্র ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচি:
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখা থেকে জারিকৃত স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৫২.৯৯.০০২.২৬.৩৬৯, তারিখ ০১ জুন ২০২৬ (১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ)-এর পরিপত্রে দেশের সকল শপিংমল, মার্কেট, দোকানপাট, মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সকল বিলবোর্ডের আলোও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, এর আগে স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৭১.৩১.০০৫.২৪.২০০ (০৫ এপ্রিল ২০২০) এর মাধ্যমে একই ধরনের নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছিল। পরে ঈদুল আজহা উপলক্ষে স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৫২.৯৯.০০২.২৬.৩২৯ (১২ মে ২০২৬) অনুযায়ী সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে সেই সিদ্ধান্তের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় সন্ধ্যা ৭টার সময়সীমা কার্যকর করা হয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, সরকারি এই নির্দেশনার পরও মেলার বিভিন্ন কার্যক্রম সন্ধ্যার পর পর্যন্ত চলতে দেখা গেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা যায়নি।
‘এক মাঠে মেলা, খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত পাঁচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী’:
গত ১৫ মে জাতীয় দৈনিক সমকাল, দৈনিক স্বাধীন সংবাদসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, একটি মাঠকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বাণিজ্য মেলার কারণে অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের মাঠ দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা এবং শিক্ষা-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
হাইকোর্টের নির্দেশনা:
বিষয়টি নিয়ে দায়ের হওয়া রিট পিটিশন নং-৬২৫৯/২০২৬ এর শুনানি শেষে গত ১৮ মে ২০২৬ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মোঃ আশিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে কোনো ধরনের বাণিজ্য মেলা আয়োজন না করার নির্দেশ দেন।
আদালত মেলা পরিপত্র-২০২৪ এর ধারা ৫(চ) উল্লেখ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এ ধরনের আয়োজনকে বিধিবহির্ভূত বলে পর্যবেক্ষণ দেন।
মেলা, মাঠ ও আইনি লড়াই:
হাইকোর্টের নির্দেশনার পর বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেলা আয়োজকদের পক্ষ থেকে আদালতের নির্দেশনার বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার চেয়ে আপিল আবেদন করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকা এবং মেলা আয়োজনের বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিবেচনাধীন থাকায় বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবাদুল হক চানের পূর্ববর্তী বক্তব্য ও বর্তমান আইনি অবস্থান নিয়েও নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সচেতন মহলের মতে, আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমেই এ বিতর্কের গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
মাঠ রক্ষার দাবিতে সক্রিয় বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, পরেশ সাগর মাঠ শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও জনস্বার্থের জন্য সংরক্ষিত থাকা উচিত। অন্যদিকে মেলা আয়োজক পক্ষের অবস্থান হলো, বিষয়টি আদালতের বিবেচনাধীন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এর নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
মানবাধিকারকর্মীদের অবস্থান:
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রনি সিকদার এক বিবৃতিতে বলেন, শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ, শিক্ষা পরিবেশ এবং আদালতের নির্দেশনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টির একটি স্থায়ী সমাধান হবে এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক অনুভূতির প্রসঙ্গ:
স্থানীয়দের একাংশের মতে, পরেশ সাগর মাঠ বরিশালের ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মরহুম মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর তাফসির মাহফিলের স্মৃতির কারণে মাঠটি বহু মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত। এ কারণে সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও কিছু সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আপত্তি উঠেছে।
জনমনে যে প্রশ্ন:
সরকারি পরিপত্র, আদালতের নির্দেশনা, শিক্ষার্থীদের মাঠ ব্যবহারের অধিকার, বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচি এবং জনস্বার্থ-সবকিছু মিলিয়ে বরিশাল বাণিজ্য মেলা এখন একটি বৃহত্তর নাগরিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, বিষয়টির সমাধান হওয়া প্রয়োজন আইন, আদালতের নির্দেশনা, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং জনস্বার্থের সমন্বয়ের মাধ্যমে। বর্তমানে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে বরিশালের নাগরিক সমাজ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন