প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিংক-ট্যাঙ্ক ‘পুলিশ এক্সিকিউটিভ রিসার্চ ফোরাম’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শহর ও জনপদগুলোর জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি সৃষ্টি করছে দ্রুত অগ্রসরমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এবং সস্তা অথচ আরও বিধ্বংসী ড্রোনের সংমিশ্রণ।
এ প্রতিবেদনটি ‘একটি স্পষ্ট ও বর্তমান বিপদ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি ড্রোন থেকে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান হুমকি সম্পর্কে সংস্থাটির দেয়া প্রথম সতর্কবার্তা নয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ড্রোন দিয়ে বড় কোনো হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে আসেনি, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সস্তা ড্রোনের সহজলভ্যতা বিশৃঙ্খলা ও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানোর সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে যখন এগুলোর সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত অধিকাংশ ড্রোনই বাণিজ্যিক ও বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয় এবং এগুলো ফেডারেল এখতিয়ারভুক্ত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এ প্রযুক্তির ঝুঁকিগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব ও জরুরি বিষয় হিসেবে দেখা, যেমনটি ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার আগে সন্ত্রাসবাদের হুমকির ক্ষেত্রে ফেডারেল তদন্তকারীদের দেয়া উচিত ছিল।
সংস্থাটির সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, খেলার দিনগুলোতে ফুটবল স্টেডিয়ামের ওপর দিয়ে অননুমোদিত ড্রোন উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে, যা জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিষয়টিকে কতটা গুরুতর করে তুলেছে তা স্পষ্ট করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিউ ইয়র্ক শহরে প্রতি মাসে প্রায় ২৩ হাজার অবৈধ ড্রোন উড্ডয়নের খবর পাওয়া যায়। এছাড়া, এ গ্রীষ্মে বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে খেলার মাঠের কাছাকাছি এলাকা থেকে শত শত ড্রোন জব্দ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক চাক ওয়েক্সলার লিখেছেন, ‘পঁচিশ বছর আগে, কল্পনাশক্তির অভাব বা দূরদর্শিতার অভাবে আমাদের জাতিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। আমরা আর সেই একই ভুল করার ঝুঁকি নিতে পারি না’।
দেশজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং এআই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে ‘স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র’-এর বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, একটি রুশ ড্রোন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পরিচালিত হয়ে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার সময় তিনজনকে হত্যা করে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়া তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকারী এআই সিস্টেমের পরীক্ষা চালাচ্ছিল। ইরানের সাথে সংঘাতের সময়, মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের নিজস্ব ‘শাহেদ’ ড্রোন বহরের মোকাবিলায় স্বল্পমূল্যের ড্রোন তৈরি ও মোতায়েন করেছিল।
গত জুন মাসে ফেডারেল কর্মকর্তারা জানান যে, হোয়াইট হাউসের লনে আয়োজিত ‘আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ ম্যাচগুলোতে হামলার একটি ষড়যন্ত্র তারা নস্যাৎ করেছেন। অভিযোগনামা অনুযায়ী, এ ষড়যন্ত্রে বিস্ফোরক-বোঝাই ড্রোন ও রাইফেলের ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল।
নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের কমিশনার জেসিকা টিশ ড্রোনের ব্যাপক বিস্তারের বিষয়ে কথা বলেছেন; একসময় ড্রোন কেবল সামরিক বাহিনীর ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে।
মে মাসে বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতির সময় এক সংবাদ সম্মেলনে মিস টিশ বলেন, ‘যদি কোনো একটি হুমকি আমাকে রাতে দুশ্চিন্তায় ফেলে রাখে, তবে তা হলো ড্রোন। বাণিজ্যিক ড্রোনগুলোকে সহজেই যুদ্ধের অস্ত্রে রূপান্তর করা সম্ভব। নিউ ইয়র্ক শহরের জন্য এই বাস্তবতাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।
গত মাসে ‘ইউএস ওপেন’ চলাকালীন মিস টিশ ঘোষণা করেন, শহরের বড় কোনো অনুষ্ঠানের সময় অননুমোদিত ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগ এখন ফেডারেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেয়েছে।
ডিসেম্বরে কংগ্রেস কর্তৃক পাস হওয়া ‘সেফার স্কাইজ অ্যাক্ট’-এর আওতায় এ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে; এ আইনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ড্রোন অকার্যকর ও ভূপাতিত করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
মি. ওয়েক্সলার জানান, এ নীতি পরিবর্তনের আগে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা সরঞ্জাম ছিল না এবং তাদের ফেডারেল কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করতে হতো। তিনি আরো বলেন, এ নীতি পরিবর্তন স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) আলাবামার হান্টসভিল-এ ‘ন্যাশনাল কাউন্টার-ইউএএস ট্রেনিং সেন্টার’ চালু করেছে।
২০১৯ সালে ‘পুলিশ এক্সিকিউটিভ রিসার্চ ফোরাম’-এর প্রথম ড্রোনবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে সংস্থাটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তা, স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান এবং ইউক্রেনের কিয়েভ অঞ্চলের ডেপুটি চিফসহ ফেডারেল কর্মকর্তাদের সাথে বিভিন্ন বৈঠক করেছে।
এফবিআই-এর সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী বিভাগের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার ও’লিয়ারি বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসীদের ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক ‘উদ্বেগজনক সম্ভাবনা’ রয়েছে এবং এটি মোকাবিলায় ‘আমাদের সক্ষমতা সীমিত’।
তিনি বলেন, ‘ড্রোন প্রযুক্তির বিবর্তন, এর ব্যাপক উপস্থিতি এবং সহজে সংগ্রহযোগ্য হওয়ার কারণে যে কেউ এটি হাতে পেতে পারে; এমনকি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এতে পরিবর্তন বা পরিবর্ধনও করতে পারে’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জননিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত অধিকাংশ ড্রোনই চীনে তৈরি, যা এ প্রযুক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ করে তুলেছে। ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন গত বছর বিদেশে তৈরি কিছু নতুন ড্রোন বিক্রি নিষিদ্ধ করেছিল; তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘নামসর্বস্ব বা শেল কোম্পানির নামে বিক্রি হওয়া রিব্র্যান্ডেড পণ্যের’ মাধ্যমে এ প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অফ টেনেসির পুলিশ বিভাগের প্রধান শন প্যাটারসন জানান, গত বছর মিস্টার ওয়েক্সলারের সাথে ইউক্রেন সফরের পর ড্রোন সম্পর্কে তার চিন্তাধারায় পরিবর্তন এসেছে। এনওয়াইপিডি-তে ২২ বছর দায়িত্ব পালনকারী এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সময় নবীন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত চিফ প্যাটারসন বলেন, তিনি ‘সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ধ্বংসাত্মক ও প্রাণঘাতী ক্ষমতা সরাসরি দেখেছেন’। তিনি আরো বলেন, ইউক্রেন সফরের সময় তিনি দেখেছেন যে, ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা কতটা সহজ হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘বড় ধরনের জনসমাগমস্থল বা ভেন্যু রয়েছে এমন এলাকার পুলিশ প্রধানরা যদি বিষয়টি নিয়ে এখনো চিন্তা না করে থাকেন, তবে তাদের এখনই এ নিয়ে ভাবা উচিত’। তিনি উল্লেখ করেন যে, তার ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটি অফ টেনেসির ক্যাম্পাসে ফুটবল খেলা দেখতেই ১ লাখ ৩ হাজারের বেশি মানুষ সমবেত হন।
সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন