প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাতের সময় তখন ৭টা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একের পর এক পোস্ট আসতে থাকে—সন্দ্বীপ চ্যানেলের ডুবো চরে ফেরি ‘কপোতক্ষ’ আটকা পড়েছে। ফেরিতে তিন শতাধিক যাত্রী রয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং একটি অ্যাম্বুলেন্সে থাকা মুমূর্ষু রোগীও অন্তর্ভুক্ত।
চারপাশে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। জানা যায়, পরবর্তী জোয়ার রাত প্রায় ৩টার দিকে আসবে। এর আগে ফেরিটির ভাসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ যাত্রীদের দীর্ঘ সময় আটকা পড়ে থাকতে হবে।
এদিকে সামনে আসে আরও উদ্বেগের খবর—ফেরির ক্যানটিনে খাবার ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে যাত্রীরা শুধু ফেরিতে আটকা পড়ার শঙ্কায় নয়, খাবার-পানি ছাড়া দীর্ঘ রাত কাটানোর আতঙ্কে ভুগতে থাকেন।
তবে খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়।
বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা খাল ও কাদামাটি মাড়িয়ে খাবার ও পানি নিয়ে ছুটে আসেন। সরকারি দল, বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের এই মানবিক উদ্যোগ সম্প্রীতি ও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ফুটে ওঠে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ফেরিঘাট থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ফেরি ‘কপোতক্ষ’ যাত্রা শুরু করে। যাত্রার মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় নাব্যতা সংকটের কারণে ডুবো চরের মুখে ফেরিটি আটকা পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফেরিতে প্রায় তিন শতাধিক যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের পাশাপাশি একটি অ্যাম্বুলেন্সে থাকা মুমূর্ষু রোগীও ছিলেন।
ফেরি আটকে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিপদগ্রস্ত যাত্রীদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশার উদ্যোগে ফেরিতে থাকা যাত্রী ও স্টাফদের জন্য রান্না করা রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সন্দ্বীপ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকেও যাত্রীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ফেরি আটকে পড়ার প্রায় দুই ঘণ্টার মাথায় দলটির নেতাকর্মীরা শুকনো খাবার ও পানি নিয়ে ফেরিতে পৌঁছে তা যাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করেন।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা অধ্যাপক আমজাদ হোসেন পরিচালিত এ.কে. ফাউন্ডেশনও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ফেরিতে আটকে থাকা যাত্রীদের মধ্যে খাবার ও পানি বিতরণ করা হয়।
যাত্রীরা খাবারের সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তারা হয়তো কল্পনাও করেননি, মুহূর্তের মধ্যেই দল-মত নির্বিশেষে এতগুলো সংগঠন ও মানুষ তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে।
ফেরিতে আটকে পড়া যাত্রী সাকিব বলেন,
“ফেরি আটকে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় ছিলাম খাবার নিয়ে। কারণ ফেরিতে অনেক বৃদ্ধ ও শিশু রয়েছে। খাবার না পেলে তাদের অনেক কষ্ট হতো। তবে আমরা কল্পনাও করিনি, এত দ্রুত এত মানুষ খাবার নিয়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে।”
শুধু খাবারের সংকট নিরসন নয়, যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতেও নেওয়া হয় বিভিন্ন উদ্যোগ।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা সন্দ্বীপ ও সীতাকুণ্ড—দুই প্রান্তের ঘাটে পুলিশ পেট্রোল টিম মোতায়েনের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি ভোররাতে ফেরি থেকে যাত্রীরা নামার পর যাতে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, সে জন্য চট্টগ্রাম প্রান্তে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাড়ির ব্যবস্থাও করেন তিনি।
এদিকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভূইয়া মিল্টনের পক্ষ থেকেও চট্টগ্রাম প্রান্তে নেমে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে দুটি বাসের ব্যবস্থা করা হয়।
ফেরি আটকে যাওয়ার বিষয়ে ফেরির মাস্টার সাইফুল দৈনিক কালবেলাকে বলেন, নাব্যতা সংকটের কারণে বারবার ফেরি আটকে গিয়ে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
তিনি বলেন, “বারবার নাব্যতা সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।”
সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমজাদ হোসেন দৈনিক কালবেলাকে বলেন, নাব্যতা সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হতো, এখন সেখানে মাত্র একটি ট্রিপ দেওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এখন দেখি কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
ফেরি আটকে পড়ার এই ঘটনায় একদিকে যেমন সন্দ্বীপ চ্যানেলের ভয়াবহ নাব্যতা সংকট ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে, অন্যদিকে বিপদের মুহূর্তে দল-মত ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিরল দৃশ্যও দেখেছে সন্দ্বীপবাসী।
একটি ফেরি, তিন শতাধিক উদ্বিগ্ন মানুষ আর গভীর রাতের অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মাঝেও মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও রাজনৈতিক সংগঠনের মানুষ।
বিপদের সেই রাতে সন্দ্বীপ আবারও দেখলো মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
মানবিক সন্দ্বীপ প্রমাণ করলো—বিপদে রাজনীতি নয়, সবার আগে মানুষ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন