প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরগুনার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির, কৃষকের আয় বাড়ানোর এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারা পরিবর্তনের বিশাল সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে। তবে উপকূলীয় এই জেলার ৩৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমি বর্তমানে সাময়িকভাবে পতিত রয়েছে, যা কৃষির সম্ভাবনাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। লবণাক্ততা, অপর্যাপ্ত সেচ, জলাবদ্ধতা, নিষ্কাশনব্যবস্থার দুর্বলতা, মানসম্মত বীজ ও কৃষি উপকরণের অভাব এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার মতো সমস্যার কারণে অনেক জমিতে সারা বছর আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিকল্পিত উদ্যোগ, উপযোগী ফসল নির্বাচন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের জন্য কার্যকর প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে এসব জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, বেতাগী ও বামনা- এই ছয় উপজেলার কৃষির বাস্তবতা একরকম নয়। কোথাও নদী ও সাগরের লবণাক্ত পানির প্রভাব, কোথাও বর্ষায় জলাবদ্ধতা, আবার কোথাও শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট কৃষকের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপকূলীয় দুর্যোগের ঝুঁকিও কৃষি পরিকল্পনাকে জটিল করে তোলে। ফলে পতিত জমির পুরো অংশকে একই পদ্ধতিতে আবাদযোগ্য করা সম্ভব নয়। জমির প্রকৃতি, মাটির লবণাক্ততা, পানির প্রাপ্যতা এবং মৌসুমি ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় জমিতে আমন ধান কাটার পর আর্দ্রতা কাজে লাগিয়ে মুগ, সরিষা, সূর্যমুখী, তিল, গম এবং বিভিন্ন শীতকালীন সবজি চাষের সুযোগ রয়েছে। বরগুনায় ফসলের বহুমুখীকরণের বাস্তব উদাহরণও দেখা যাচ্ছে। তালতলী উপজেলার সওদাগরপাড়া গ্রামে একসময় লবণাক্ততার কারণে অনাবাদি থাকা জমিতে কৃষকেরা মাটি উঁচু করে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ শুরু করেন। বর্তমানে সেখানে প্রায় দুই শতাধিক চাষি সবজি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এছাড়া, আমন ধান কাটার পর সরিষা চাষের সম্প্রসারণ নতুন আশা জাগিয়েছে। বরগুনা সদর থেকে পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী ও বেতাগী পর্যন্ত বারি-১৪, বারি-১৭, বারি-১৮, বারি-১৯ এবং টরি-৭ জাতের সরিষা চাষ বেড়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরগুনা সদরেই ১৪৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে।
তবে উপকূলীয় এলাকায় মাটির লবণাক্ততা, শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট, বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা এবং ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা কৃষকের বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিকের সংকট, কৃষিঋণ পেতে জটিলতা এবং ফসল বিক্রির সময় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার সমস্যা।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউনিয়নভিত্তিক পতিত জমির নির্ভুল তালিকা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। লবণসহিষ্ণু ও স্বল্পমেয়াদি জাতের বীজ সরবরাহ, খাল ও নালা পুনঃখনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সাশ্রয়ী সেচ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সহজ শর্তে কৃষিঋণ, প্রণোদনা এবং ফসল কাটার পর সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বরগুনার ৩৩ হাজার হেক্টরের বেশি সাময়িক পতিত জমিকে আবাদযোগ্য করার লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএডিসি, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পতিত জমিকে উৎপাদনমুখী এবং তিন ফসলি আবাদের আওতায় আনা গেলে এটি উপকূলীয় অর্থনীতির রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন