প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওয়াশিংটনে বসবাসকারী ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক সোরুশ একের পর এক বন্ধু হারাতে শুরু করেন।
সোরুশ, যিনি তেহরানের ইসলামি সরকারের বিরোধী, তার বিশ্বাস হলো, যুদ্ধ করে ‘কোনো কিছুই ভালো হবে না’ বলে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত অন্যান্য ইরানিরা তাকে তাদের নিপীড়কদের সমর্থক হিসেবে অভিযুক্ত করতে শুরু করেন।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
অন্যদিকে, আরেক ইরানি-আমেরিকান বাহারও প্রবাসী ইরানি সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তবে তার বিচ্ছিন্নতার কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের জোরালো সমর্থক।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ৭ লাখ ৫০ হাজার ইরানির মধ্যে তেহরানের ইসলামি সরকারের বিরোধিতা নিয়ে ব্যাপক ঐক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। দেশের সামরিক অবকাঠামোর বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
তবে, নিজ দেশে ৪৭ বছরের ধর্মীয় শাসনের অবসান ঘটাতে যুদ্ধটি সফল হবে কি না, তা নিয়ে প্রবাসী ও নির্বাসিত ইরানিদের মধ্যে গভীর বিভাজন দেখা দিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, স্যাক্রামেন্টোর ইরানি ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক সাহার রাজাভি বলেন, ‘পারিবারিক সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে বা ভেঙে গেছে। এমনকি আজীবনের বন্ধুত্বও এ কারণে শেষ হয়েছে।’
তিনি মনে করেন, আগে থেকেই থাকা মতবিরোধকে যুদ্ধ আরও তীব্র করেছে।
এএফপি ওয়াশিংটন এলাকায় বসবাসকারী ইরানি সম্প্রদায়ের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বন্ধু ও স্বজনদের বিষয়ে কথা বলার সময় পুরো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
সোরুশ একজন থ্রিডি শিল্পী ও অ্যানিমেটর। তিনি এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে, এমনকি নিজের ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গেও তার সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আগের যুদ্ধগুলোর নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি তাদের বলেছিলেন, ‘ইরানের মানুষ বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের হারাবে। তারা চাকরি হারাবে, সঞ্চয় হারাবে।’
ইসলাম ধর্ম থেকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করা সোরুশ এএফপিকে বলেন, ‘তারাই এর ভুক্তভোগী, ইরানি প্রবাসীরা নয়।’
শহরের কেন্দ্রের একটি কফিশপে বসে বাহার ও আহু সিগারচি- এর বিপরীত মত প্রকাশ করেন। বাহার চিকিৎসা খাতে কাজ করেন। আহু একটি ব্যাংকে কর্মরত।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় তারা ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, সরকার উৎখাতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
ইরানের নির্বাসিত প্রয়াত শাহের ছেলে রেজা পাহলভির দৃঢ় সমর্থক আহু বলেন, ‘ইরানে আমাদের সবার পরিবার ও বন্ধু রয়েছে। তারা যে কথাগুলো বলতে পারছে না, আমরা শুধু সেসব কথাই বলছি।’
রেজা পাহলভি তখন একটি বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছিলেন। পরে তিনি প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে সমর্থন সংগঠিত করেন।
আহু বলেন, ‘আমি মনে করি, যুদ্ধ নিয়ে আমরা সঠিক পথেই আছি। মানুষ যা চায়, শিগগিরই আমরা সেখানে পৌঁছাব।’
সামরিক হস্তক্ষেপের পরও সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা এড়িয়ে যান।
আহু বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, আমাদের অন্য কোনো সমাধান নেই।’
জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে বিপাকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যে যুদ্ধটি ব্যাপক অজনপ্রিয়।
যুদ্ধবিরোধী সংগঠন ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের উদ্যোগে পরিচালিত জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরানি প্রবাসীদের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন দ্রুত কমেছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি সম্প্রদায় প্রায় সমান দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। তবে এক মাস পর পরিচালিত দ্বিতীয় জরিপে দেখা যায়, ৬৬ দশমিক ১ শতাংশ যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। আর ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ যুদ্ধকে সমর্থন করছে।
রাজাভি বলেন, যারা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন এবং বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া সরকার পরিবর্তন নিয়ে সংশয়ী ছিলেন, তারা নিজেদের অবস্থান সঠিক প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করছেন। তবে অনেক সমর্থক ‘আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ইরানি সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেছে এমন একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু অংশও রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ইরানি প্রবাসীদের মধ্যে আমি এ প্রবণতা দ্রুত বাড়তে দেখছি।’
তেহরানে কর্মরত সাবেক সাংবাদিক মোহাম্মদ রেজা মুসাভি যুদ্ধ ও ইরানের সরকারÑদুটোরই বিরোধী। তিনি মনে করেন, যুদ্ধের প্রতি আগ্রহ কমে আসছে। তবে যারা যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের অসহিষ্ণুতায় তিনি ক্ষুব্ধ।
তিনি বলেন, ‘তারা খুব সহজেই আপনার গায়ে যেকোনো তকমা লাগিয়ে দিতে পারে, যদি তারা বুঝতে পারে যে আপনি সব বিষয়ে তাদের সঙ্গে একমত নন।’
রাজাভির মতে, ইরানি সম্প্রদায়ের যেসব সংগঠন ফারসি ভাষার ক্লাস বা ফারসি কবিতা পাঠের আয়োজন করত, তারা ‘মুক্তির সংগ্রাম’-এর পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন না জানালে ‘কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ত।’
তবে পাহলভির সমর্থকরা বলছেন, সম্প্রদায়ের চাপ একতরফা নয়।
একজন শিক্ষক ক্লাসে বারবার যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলায় তিনি তার আট বছর বয়সী ছেলেকে ইরানি শিল্প ও সংগীত শেখানো হয় এমন একটি স্কুল থেকে সরিয়ে নিয়েছেন।
তবে যুদ্ধ যেভাবে ইরানি সম্প্রদায়কে নাড়িয়ে দিয়েছে, সে বিষয়ে মুসাভি বাস্তববাদী।
তিনি বলেন, ‘কঠিন সময়ে আপনি আপনার আশপাশের মানুষদের বুঝতে পারেন। তারা আসলে কেমন মানুষ, তা বুঝতে পারেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন