প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে জেলা হিসাব ও অর্থ (অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স) কার্যালয়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিল নিষ্পত্তি, পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধার অর্থ ছাড়েও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের।
এসব বিষয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রধান হিসাব মহানিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষকের (সিএজি) কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মধ্যে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেত্রকোনা জেলা শাখার আহ্বায়ক মো. আবদুল গাফফারও রয়েছেন। জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স কর্মকর্তা মো. মনজুরুল কবীরসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান তিনি।
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। এ জন্য গত ২০ মে ই-টেন্ডার আহ্বান করা হয়। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৫ টাকা ৮৯ পয়সা। পরে বগুড়ার সালেক সোলার পাওয়ার লিমিটেডকে কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আবদুল গাফফারের অভিযোগ, কাজ পাওয়ার প্রায় এক মাসের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ও ওয়ার্ক অর্ডার সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স কার্যালয়ে বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিলের ভাউচার প্রস্তুত ও অনুমোদন করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় অভিযোগে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় শতাধিক সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। এটি প্রকল্পের মোট কাজের প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে স্থাপন করা প্যানেলগুলোর সঙ্গে এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজেরও উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও অসম্পন্ন রয়েছে।
এদিকে, প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জেলা হিসাব ও অর্থ কার্যালয়ে প্রকল্পটির বিলসংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য না দিয়ে এক সপ্তাহ সময় নেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক কর্মচারীর দাবি, এই সময়ের মধ্যে তড়িঘড়ি করে বেশ কিছু সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে।
শুধু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিল নয়, নেত্রকোনা জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স কার্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম ঘিরেও অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। বৈধ বেতন-ভাতা ও ইনক্রিমেন্টের বিল নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনসংক্রান্ত কাজেও অনৈতিকভাবে অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে সাত শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ বা কমিশন দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও নানা ধরনের হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে গত ৫ মে জেলা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের উচ্চমান সহকারী আব্দুল কাইয়ুম তালুকদার ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের অফিস সহকারী এনামুল হক। যৌথ স্বাক্ষর করা ওই অভিযোগে কার্যালয়ের একজন অডিটর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হয়রানি, অসদাচরণসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
নেত্রকোনা পৌর শহরের সাতপাই এলাকার বাসিন্দা ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শিকা নাসিমা সিদ্দিকীর স্বামী মো. আবু তাহের বলেন, ‘আমার স্ত্রী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পেনশনে যান। সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নানা টালবাহানা করা হচ্ছিল। পরে অনৈতিক লেনদেনের পর কাজটি করে দেওয়া হয়।’
অভিযোগকারী মো. আবদুল গাফফার বলেন, ‘জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স কর্মকর্তা মো. মনজুরুল কবীরকে এসব বিষয়ে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান সালেক সোলার পাওয়ার লিমিটেডের ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে প্রকল্পের বিল ও কাজের অগ্রগতি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স কর্মকর্তা মো. মনজুরুল কবীর বলেন, ‘রুফটপ সোলারের যে বিল দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ম মেনেই দেওয়া হয়েছে।’ তবে অভিযোগের অন্যান্য বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পটির কাজ চলমান রয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যেই কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর বিল দেওয়া হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলের সমপরিমাণ অর্থের একটি চেক জামানত হিসেবে রাখা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন