প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ একটি সমস্যা হচ্ছে মাদকাসক্তি। পৃথিবীজুড়ে মাদকের কড়াল গ্রাসে সম্ভাবনাময় তরুণ সম্প্রদায়ের একটি বৃহৎ অংশের কর্মদক্ষতা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। এবং এই মাদকের বাজারে সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে গাঁজা। সারা বিশ্বে সাড়ে ২৫ কোটি মানুষেরও বেশি মানুষ নিয়মিতভাবে গাঁজা সেবন করে। আফিম, অ্যামফিটামিন, কোকেন ও এক্সট্যাসির মতো মারাত্মক মাদকগুলোর সম্মিলিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা থেকেও এই পরিসংখ্যান অনেক বেশি।
সম্প্রতি জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
গত শুক্রবার (২৬ জুন) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক দশকের মধ্যে বিশ্বব্যাপী গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালে এই মাদক ব্যবহারকারী জনসংখ্যার হার ছিল ৩.৮ শতাংশ, যা বর্তমানে ২০২৪ সাল নাগাদ ৪.৮ শতাংশের উপরে উঠতে পারে।
প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১০ থেকে ১২ বছরে গাঁজা সম্পর্কে মানুষের ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে এবং পাচারের নতুন পদ্ধতির কারণে এর সেবনকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
ইউএনওডিসির মতে, গাঁজার উৎপাদন, পাচার এবং ব্যবহার – সবই পরিবর্তনশীল। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, মানুষ গাঁজা সম্পর্কে তাদের ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার মতো দেশে গাঁজাকে বৈধকরণ এবং অপরাধমুক্ত করার নীতি গ্রহণ করায় এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঐতিহাসিকভাবে গাঁজার বেশিরভাগ পাচার প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু, উত্তর আমেরিকা থেকে অবাধ সরবরাহ আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উত্তর আমেরিকার বাইরের ৫৭টি দেশ বা অঞ্চল গাঁজা জব্দের উৎস অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী দশকে ছিল মাত্র ১১টি।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদিও বিশ্বব্যাপী গাঁজার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে গত এক বছরে গাঁজা ব্যবহারের হার উত্তর আমেরিকায় সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে কানাডার ৩২.৪ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৬.৪ শতাংশ মানুষ গাঁজা ব্যবহার করে। মোট হিসাবে মহাদেশটিতে গাঁজার সেবনকারীর সংখ্যা ৭ কোটির কাছাকাছি (৬ কোটি ৯৩ লাখ) হয়ে উঠেছে।
মহাদেশের পরিসংখ্যানে উত্তর আমেরিকার পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গাঁজা সেবনকারী দেশের তালিকায় রয়েছে এশিয়া। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, এই মহাদেশে নিয়মিত গাঁজা সেবন করেন ৬ কোটি ৮৫ লাখেরও বেশি মানুষ। গাঁজা সেবনের দিক থেকে পরে রয়েছে আফ্রিকা, যেখানে গাঁজার আসক্ত ৬ কোটি ৫১ লাখেরও বেশি মানুষ।
অন্যদিকে ইউরোপে গাঁজা সেবনকারী ৩ কোটি ১৩ লাখ, দক্ষিণ আমেরিকায় ১ কোটি ৫৭ লাখ এবং ওশেনিয়ায় সাড়ে তিন কোটিরও বেশি দেশ নিয়মিত এই মাদক সেবন করে।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড (১৪.১ শতাংশ), স্পেন (১২.৬ শতাংশ), উরুগুয়ে (১২.৩ শতাংশ) এবং অস্ট্রেলিয়া (১১.৫ শতাংশ) থেকেও গাঁজার ব্যাপক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মাদক বিস্তারসহ মাদকের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে গাঁজা সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ। তাছাড়া, ইয়াবা, অ্যালকোহল, কফ সিরাপ, হেরোইনসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক সেবনের খবরও রয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। এতে বাংলাদেশে ৮ বিভাগে ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
গবেষণায় পরিস্কার হয়েছে, ময়মনসিংহ (৬.০২ শতাংশ), রংপুর (৬.০০ শতাংশ) ও চট্টগ্রাম (৫.৫০ শতাংশ) বিভাগের মধ্যে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। তবে, সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকার বিভাগে, প্রায় ২২.৯ লাখ।
উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মাদক সেবকের প্রসঙ্গে বেশিরভাগই তরুণ। গবেষণা অনুসারে, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮-১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেন এবং ৫৯ শতাংশ ১৮-২৫ বছর বয়সের মধ্যে। বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা ও মানসিক চাপের মতো বিভিন্ন সামাজিক কারণে মাদক সেবন বাড়ছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে মাদক সহজলভ্য।
গবেষণায় উঠে এসেছে, মাত্র ১৩ শতাংশ মাদকসেবী চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকেই মাদক ছাড়তে অক্ষম হচ্ছেন। ৬৯ শতাংশ মাদকসেবী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবা চেয়েছেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেছেন, "মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা। তাই রাজনৈতিক সংকল্প এবং গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।"
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তির ঝুঁকি বেড়েছে। সরকার ইতোমধ্যে ৭ বিভাগে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছে। পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মাদক নির্মূল নিশ্চিত করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন