প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নাজিরারটেক শুঁটকি পল্লি গড়ে উঠেছে পৌরসভার ১ ও ২ নং ওয়ার্ডের ১৮টি গ্রাম নিয়ে। এখানে প্রায় ৬শ’টি মহাল (শুঁটকি উৎপাদনের খামার) রয়েছে। জেলার টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী ও সোনাদিয়া দ্বীপেও শুঁটকি উৎপাদনের খামার বিদ্যমান।
গত ২৯ অক্টোবর সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই কক্সবাজার উপকূলে শুঁটকি মাছ উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কক্সবাজার উপকূলে আট শতাধিক মহালে দৈনিক ১শ’ ৫০ মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এ বছর জেলা থেকে ৫শ’ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদনের আশা করছেন উৎপাদনকারীরা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে নাজিরারটেক এলাকার নেয়ামত এন্টারপ্রাইজ মহালে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছেন, এর মধ্যে ৯ জন নারী। সাবেকুন্নাহার নামের একজন নারী শ্রমিক বলেন, "এখন শুঁটকির ভরা মৌসুম চলছে। দীর্ঘদিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকার পর ৫ দিন আগে মাত তোরা (মাছ ধরা) আবার শুরু হয়েছে। এরপর থেকে শুটকি উৎপাদনে ধুম পড়েছে।"
কামাল ট্রেডার্স নামে একটি মহালে ৫০ মণ শুঁটকি রয়েছে। সেখানে নিয়োজিত শ্রমিক মামুনুল হক জানান, শীতকালে শুঁটকির চাহিদা বেশি থাকে। তবে শুঁটকি উৎপাদন মূলত নির্ভর করে সাগরে কী পরিমাণ মাছ ধরা পড়ছে, তার ওপর। ট্রলারের জালে বেশি মাছ ধরা পড়লে শুঁটকির উৎপাদনও বেড়ে যায়।
আলম এন্টারপ্রাইজ মহালের মালিক মো. আলম বলেন, সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মহালগুলোতে কাজ চলে। কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে আসা বিপুলসংখ্যক পর্যটক বাড়ি ফেরার সময় কয়েক কেজি করে শুঁটকি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে কক্সবাজারে পর্যটকের আগমন বাড়লে শুঁটকির চাহিদাও বাড়ে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় কক্সবাজার পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের নাজিরারটেক শুটকি মহালে গিয়ে দেখা যায়, গভীর সাগর থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে ঘাটে ভিড়ছেন। ব্যবসায়ীরা সেই মাছ কিনে মহালে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ধুয়েমুছে মাছগুলো শুঁটকি করার জন্য বাঁশের তৈরি মাচায় তুলে দিচ্ছেন শ্রমিকরা।
তিনি জানান, এসব মাছের মধ্যে বেশির ভাগ লইট্টা, ছুরি, পোপা, মাইট্যা, কামিলা, ফাইস্যা ও রূপচান্দাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। এসব মাছ সংগ্রহ করে ধুয়েমুছে তপ্ত রোদে ঘাম ঝরিয়ে শুঁটকি তৈরির কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন বেশির ভাগ নারী শ্রমিক। অনেক নারীই এ পেশাকে একমাত্র অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
নারী শ্রমিক রোকেয়া বেগম বলেন, "সাগর থেকে আহরণকৃত মাছ প্রথমে বেছে পৃথক করি। তারপর রোদে শুকাই। আমার তিন সন্তান রয়েছে। দু’জন স্কুলে পড়ে, খরচ নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে আছি। তাই কয়েক বছর ধরে এ কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে।"
ব্যবসায়ীরা যা বলছেন:
শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, শহরের ছোট-বড় ৬ শতাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় পর্যটকের জন্য খাবারের সঙ্গে শুঁটকির ভর্তা রাখতে হচ্ছে। তাই পর্যটক বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে শুটকির দামও বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ী মোস্তফা সরওয়ার বলেন, "১৫ থেকে ২০ হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করেন। চলতি মৌসুমে সাগরে মাছ কম, তাই দামও বেশি। সঠিক বাজারমূল্য পেলে আশা করছি লাভ হবে। এ পর্যন্ত এক কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে।"
আমান ট্রেডার্স মহালের মালিক আমান উল্লাহ জানান, শীতের শুরুতে যে শুঁটকি উৎপাদিত হয়, তার কদর দেশব্যাপী। পুরোনো শুঁটকির তুলনায় নতুন শুঁটকির দাম প্রতি কেজিতে ১শ’ থেকে ৩শ’ টাকা বেশি। আগামী মে পর্যন্ত এ শুঁটকি উৎপাদন চলবে।
নাজিরটেক শুঁটকি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি নেয়ামত উল্লাহ বলেন, মহালে উৎপাদিত শুঁটকি ব্যবসায়ীরা কিনে এনে প্রথমে গুদামে মজুত করে রাখেন। তারপর প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও মঙ্গলবার শুঁটকি ট্রাকবোঝাই করে চট্টগ্রামে সরবরাহ করা হয়। গত ৫ দিনে ৩০ ট্রাক (প্রতি ট্রাকে ১২-১৩ টন) শুঁটকি পাঠানো হয়েছে। এবার চড়া মূল্যে কাঁচা মাছ কিনতে হচ্ছে বলে গত বছরের তুলনায় শুঁটকির দাম অনেক বেড়েছে বলে জানান নেয়ামত উল্লাহ।
স্থানীয় মহাল ও বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, মহালে উৎপাদিত প্রতি কেজি ছুরি শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫শ’, লইট্যার কেজি ৫শ’ থেকে ১২শ’, ফাইস্যা ৩শ’ থেকে ৩শ’ ৫০, পোপা ৫শ’ থেকে ৮শ’, মাইট্যা ১২শ’ থেকে ১৫শ’, রূপচাঁদা ৩২শ’ থেকে ৩ হাজার ৭শ’, লাক্ষ্যা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩শ’ ও কোরাল ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টাকায়।
স্থানীয় খুচরা বাজারে এসব শুঁটকি কেজিতে আরও ৫০ থেকে ২শ’ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুঁটকির দাম গত বছরের তুলনায় এবার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় শুঁটকি উৎপাদন হয়ছিল ৩৯ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২০২৭) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪২ হাজার মেট্রিক টন। তবে প্রতিদিন যে পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে, তাতে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
জেলার এ মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, শীত মৌসুমের শুরুতে কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিবছর মূলত অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে শুরু হয়ে শুঁটকি উৎপাদন চলে শীতকাল জুড়ে।
বাংলাদেশ শুঁটকি মাছ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুল শুক্কুর জানান, জেলার অন্তত ৪০টি মহাল থেকে গত বছর হংকং, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় শুধু পোপা শুঁটকি রপ্তানি করে প্রায় ২শ’ কোটি টাকা আয় করা হয়। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এ বছর শুঁটকি রপ্তানি থেকে ৩শ’ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বেশি রপ্তানি হয় পোপা শুঁটকি। কারণ পোপা শুঁটকি দিয়ে সুস্বাদু স্যুপও তৈরি হয়।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ভ্রমণে আসা পর্যটকসহ দেশের মানুষকে বিষমুক্ত শুঁটকি সরবরাহ করতে কাজ চলছে। গত বছর কক্সবাজারে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। পরিবেশ-পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এবার শুঁটকির উৎপাদন ৫শ’ কোটি টাকার কাছাকাছি যেতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন