প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের জন্য নতুন ধরনের শেয়ার চালুর পরিকল্পনা করেছে। তবে এই পরিকল্পনার একটি বিশেষ দিক হলো, নতুন শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করলেও কোম্পানির ওপর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক জাকারবার্গের নিয়ন্ত্রণ কমবে না। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি ভোটাধিকারহীন ‘ক্লাস সি’ শেয়ার চালু করতে যাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বুধবার মেটা জানিয়েছে, নতুন শেয়ার ইস্যু করে এআই খাতে বিনিয়োগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ এবং কর্মীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন শেয়ারগুলো কেনাবেচার সুযোগ থাকবে। তবে এসব শেয়ারের মালিকেরা কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভোট দিতে পারবেন না।
মেটার নতুন শেয়ার পরিকল্পনা কী?
মেটা ‘ক্লাস সি’ নামে নতুন এক ধরনের শেয়ার চালুর পরিকল্পনা করছে। এই পরিকল্পনার আওতায়, বর্তমান ক্লাস এ ও ক্লাস বি শেয়ারের প্রতিটির বিপরীতে একটি করে ক্লাস সি শেয়ার দেওয়া হবে। এর ফলে কার্যত শেয়ারের সংখ্যা দুই গুণ হবে। নতুন শেয়ারগুলো ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে বাজারে লেনদেন শুরু করতে পারে।
কম্পানিটি জানিয়েছে, নতুন শেয়ার থেকে পাওয়া অর্থ এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন, অধিগ্রহণ এবং কর্মীদের পারিশ্রমিকসহ বিভিন্ন করপোরেট কাজে ব্যবহার করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে নতুন শেয়ারও ইস্যু করতে পারবে মেটা।
এআই খাতে বিনিয়োগের জন্য নতুন শেয়ার ইস্যু করার কারণ হলো, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ডেটা সেন্টার নির্মাণ, উন্নত চিপ কেনা এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মূলধনি ব্যয় ১৩৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এত বড় বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিলে কম্পানির ঋণের বোঝা বাড়তে পারে এবং ক্রেডিট রেটিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ঋণের পরিবর্তে শেয়ার ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহের পথ বেছে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্টক ট্রেডার নেটওয়ার্কের প্রধান বাজার কৌশলবিদ ডেনিস ডিকের মতে, এআই সম্প্রসারণে অর্থ সংগ্রহের জন্য নতুন শেয়ার ইস্যু করা ঋণ বাড়ানোর তুলনায় ভালো বিকল্প হতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এআই খাতে বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়ায় ওরাকল ও কোরউইভের মতো কোম্পানির শেয়ারের ওপর চাপ তৈরি হতে দেখা গেছে।
কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখবেন জাকারবার্গ?
মেটার নতুন পরিকল্পনার মূল বিষয় হলো, অর্থ সংগ্রহ করলেও জাকারবার্গের ভোটাধিকার কমানো হবে না। বর্তমানে কোম্পানির ক্লাস বি শেয়ারের মাধ্যমে তিনি অন্য শেয়ারধারীদের তুলনায় বেশি ভোট দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। নতুন ক্লাস সি শেয়ারে ভোটাধিকার না থাকায় এসব শেয়ার বিক্রি করলেও কোম্পানির সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে না।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত জাকারবার্গের কাছে প্রায় ৩৪ কোটি ১২ লাখ ক্লাস বি শেয়ার এবং ১২ লাখ ক্লাস এ শেয়ার ছিল। এসব শেয়ারের মাধ্যমে মেটার মোট ভোটক্ষমতার প্রায় ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। যদিও কোম্পানিতে তার মালিকানার পরিমাণ প্রায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যমান শেয়ারগুলোর বিপরীতে তিনি প্রায় ৩৪ কোটি ২৪ লাখ ক্লাস সি শেয়ার পাবেন। তবে প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শেয়ারধারীদের জন্য করা আলাদা চুক্তি অনুযায়ী, এ গ্রুপের পাওয়া ক্লাস সি শেয়ারের মাত্র ২০ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাকি শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে, যাতে ভোটক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে নিজের শেয়ার থেকে বিপুল অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে।
আগে কি এমন পরিকল্পনা নিয়েছে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান?
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট। ২০১২ সালে গুগলও ভোটাধিকারহীন ক্লাস সি শেয়ার চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। পরে এ নিয়ে শেয়ারধারীদের পক্ষ থেকে আইনি মামলা হয়। ২০১৩ সালে আদালত সমঝোতা অনুমোদন করে।
সমঝোতা অনুযায়ী, প্রথম বছরে ক্লাস সি শেয়ারের দাম ক্লাস এ শেয়ারের তুলনায় ১ শতাংশের বেশি কমে গেলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারধারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের এপ্রিলে শেয়ারগুলো বিতরণ করা হয়। পরের বছর গুগল নির্ধারণ করে, দামের পার্থক্যের ভিত্তিতে ক্লাস সি শেয়ারধারীদের ৫২২ মিলিয়ন ডলার সমন্বয়মূল্য দিতে হবে।
জাকারবার্গের ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয়টিও কি আছে?
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বিলিয়নিয়ারদের সম্পদের ওপর প্রস্তাবিত করও এ পরিকল্পনার আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরের ব্যালটে থাকা প্রস্তাবিত এ কর কার্যকর হলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা হিসেবে বিবেচিত বিলিয়নিয়ারদের নিট সম্পদের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ কর আরোপ করা হতে পারে।
মেটার নথি অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই করের কারণে জাকারবার্গ ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে বিশেষ কমিটিকে জানিয়েছেন। ভোটাধিকারহীন শেয়ার থাকলে তিনি নিজের ভোটক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে না কমিয়েও কিছু শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবেন।
তবে মেটার পরিচালনা পর্ষদের বক্তব্য, কম্পানিতে জাকারবার্গের বিদ্যমান মালিকানাই শেয়ারধারীদের সঙ্গে তার স্বার্থের যথেষ্ট সামঞ্জস্য তৈরি করে। তাই তাকে অতিরিক্ত নগদ পারিশ্রমিক বা নতুন ইকুইটি পুরস্কার দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করে পর্ষদ।
মেটার নতুন শেয়ার পরিকল্পনার লক্ষ্য একদিকে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহ করা, অন্যদিকে কম্পানির ওপর জাকারবার্গের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন রাখা। তবে নতুন শেয়ার বাজারে আসার পর বিনিয়োগকারীরা কীভাবে সেগুলো গ্রহণ করেন, তা নির্ভর করবে শেয়ারের চাহিদা, মূল্য এবং কম্পানির ভবিষ্যৎ আর্থিক ফলাফলের ওপর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন