প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে অপরিকল্পিত খাল ভরাট, দখল এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবের কারণে চরম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলায় বছরের সাত-আট মাস প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে থাকে। এর ফলে কৃষকরা বছরে দুই থেকে তিনবার ফসল উৎপাদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের মতে, জলাবদ্ধতা দূর হলে আমন ও আউশ মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার টন ধানসহ অন্যান্য শস্য উৎপাদন সম্ভব হতো, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
পদ্মা, গড়াই, কালীগঙ্গা ও ডাকুয়া নদীবেষ্টিত এই উপজেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এলাকায় সেচের জন্য ছোট-বড় অসংখ্য জিকে খাল থাকলেও পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো পরিকল্পিত নালা নেই। বিদ্যমান খালগুলোও নিয়মিত সংস্কারের অভাবে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও খাল ভরাট করে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে, আবার কোথাও আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে অবাধে চলছে মাছ চাষ। বিলসংলগ্ন খালগুলোতেও পুকুর কাটা হয়েছে। এর ফলে বিস্তীর্ণ এলাকার তিন ফসলি জমি বছরের পর বছর এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে এবং খাদ্য উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সম্প্রতি উপজেলার বহলবাড়ীয়া, চাঁদপুর, বাঁশআড়া, বাঁখই, করাতকান্দি ও জগন্নাথপুর বিল পরিদর্শন করা হলে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। আবাদি জমিতে জন্মেছে কচুরিপানা, কলমি ও শাপলাসহ নানা ধরনের আগাছা। নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ ডিঙি নৌকায় মাছ ধরছেন, আবার কেউ চলতি বোরো মৌসুমে আবাদের জন্য বাড়তি খরচ করে জমির আগাছা পরিষ্কার করছেন। লাগাতার লোকসানের মুখে টিকতে না পেরে অনেক কৃষক আবাদি জমিতে পুকুর খনন করে মাছ চাষে বাধ্য হচ্ছেন।
জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নন্দলালপুর ইউনিয়নের বহলবাড়ীয়া বিলের কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, তার ১৬ বিঘা জমি রয়েছে। এক দশক আগে খাল দিয়ে গড়াই নদীতে স্বাভাবিকভাবে পানি নেমে যেত এবং বছরে তিনবার ধান চাষ করা যেত। কিন্তু বর্তমানে পানি বের হতে না পারায় কোনোমতে কেবল বোরো ধানের আবাদ হয়। একই এলাকার কৃষক মাজেদ আলী ও গোবিন্দপুর বিলের আব্দুস সামাদ জানান, চারদিকে নদী থাকলেও নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় জমিতে ব্যাপকভাবে আগাছা জন্মাচ্ছে। প্রতি বিঘা জমি পরিষ্কার করতে ছয়জন শ্রমিকের মজুরি দিতে হয়। সদকী ইউনিয়নের করাতকান্দি বিলের কৃষক আজাহার বিশ্বাস জানান, একবার চাষে প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৪ মণ ধান পাওয়া যায়, যার আয় আগাছা পরিষ্কারের খরচেই শেষ হয়ে যায়। স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন, পরিকল্পিত খাল খনন করা হলে এসব জমিতে অনায়াসেই বছরে তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব হবে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় আবাদি জমির মধ্যে নন্দলালপুর ইউনিয়নে ২৯০, সদকীতে ২৫০, জগন্নাথপুরে ২৪০, শিলাইদহে ২০৫, যদুবয়রাতে ৭৫, কয়াতে ১২০ এবং চাপড়া ইউনিয়নে ৭০ হেক্টরসহ মোট প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে মারাত্মক জলাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিবছর বৃষ্টিপাতের কারণে এই জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ বাড়ছে। ২০২৪ সালে যেখানে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ ছিল ৫১০ হেক্টর, এ বছর তা দ্বিগুণেরও বেশি ছাড়িয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন জানান, বর্তমানে জলাবদ্ধ এসব জমিতে শুধু বোরো মৌসুমে ৬ হাজার ২২৫ টন ধান উৎপাদন হয়। আমন ও আউশ মৌসুমে চাষাবাদ করা গেলে আরও ১০ হাজার টন শস্য উৎপাদন সম্ভব হতো, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, সরকারের চলমান খাল খনন প্রকল্পে কুমারখালীর দুটি খালের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। খনন প্রকল্প শুরু হলে এলাকার জলাবদ্ধতা অনেকটাই নিরসন হবে। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষি বিভাগ, কৃষক, বিএডিসি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন