প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্য এবং বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ইরানের রাজধানী তেহরানে ‘মক্কা এলায়েন্স’-এর সদস্য—সউদী আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা সোমবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। বৈঠকে ইরান ও তিন মুসলিম পরাশক্তির প্রতিনিধিরা আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করতে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান।
ফার্স নিউজ এজেন্সির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মক্কা এলায়েন্সের সদস্য দেশগুলোর সাথে ইরানের এই বৈঠকটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলো পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। ইরানের প্রভাবশালী সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপ-সচিব আলী বাঘেরি কানির বক্তব্য উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা 'প্রেস টিভি' জানায়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুসংহত করার লক্ষ্যেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যকে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার হাত থেকে রক্ষা করতে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে সম্ভাব্য হামলার ছক কষছেন আমেরিকান ও ইসরায়েলি নীতি নির্ধারকরা। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সউদী আরব এবং ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত মারাত্মক রূপ নিয়েছে। দুই পক্ষই রাজ্যটির বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেলক্ষেত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
চলতি বছরই সউদী আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মিলে 'মক্কা প্যাক্ট' নামে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। সউদী-হুথি সংঘাত নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার পর ইরানের সাথে তিন দেশের এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের যৌথ বৈঠক। সউদী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে সউদী আরবের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান। ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই বৈঠকে অংশ নিতে তেহরানে উপস্থিত হয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন।
সোমবার বিকেলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানায়, প্রতিনিধি দলটি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মহসেন রেজাইয়ের সাথে বৈঠকে বসেছেন। এর ঠিক একদিন আগে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ ঠেকানোর প্রচেষ্টায় কাতারের প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করে বলে জানান ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। এছাড়া, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত সপ্তাহেও পাকিস্তান সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেছিলেন।
চলতি আলোচনা সম্পর্কে অবহিত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সোমবারের এই আলোচনা মূলত কাতার ও পাকিস্তানের চলমান মধ্যস্থতাকেই সমর্থন যোগাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি কূটনৈতিক সমাধানের উদ্দেশ্যে ইরান যেন প্রয়োজনীয় নমনীয়তা দেখায়, সে ব্যাপারেও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বৈঠক সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া দুই কূটনৈতিক সূত্র জানান, কাতার এমন একটি সমঝোতার ওপর কাজ করছে যেখানে ৫ দিনের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরকে কিছু সুনির্দিষ্ট ছাড় দেবে।
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী 'স্ট্রেট অফ হরমুজ' উন্মুক্ত করে দেবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ তুলে নেবে, যা দেশটির অর্থনীতিকে কোণঠাসা করে রেখেছে। তবে এই চুক্তির মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো পক্ষ আগে ছাড় দেবে তা নির্ধারণ করা। মধ্যস্থতাকারীরা চাচ্ছেন চুক্তি শুরুর প্রাথমিক ধাপেই যেন ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি বড় ধরনের ছাড় দেয়।
তবে ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত কমানোর বিষয়টি শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছে। গত সপ্তাহে মহসেন রেজাই কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, "সমৃদ্ধ পারমাণবিক পদার্থের একটি একক কণাও ইরানের বাইরে যাবে না।" ইরানি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই সমঝোতা পৌঁছানোর বিষয়ে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি পুনরায় হামলার শিকার হয়, তবে তাদের সশস্ত্র বাহিনী জবাব হিসেবে আঞ্চলিক ডেটা সেন্টার এবং পানির নিচে থাকা সাবমেরিন ইন্টারনেট ক্যাবলগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানাবে।
ইয়েমেনের হুথিদের ধারাবাহিক হামলায় সউদী আরব যখন বিপর্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে শীর্ষ সউদী কর্মকর্তাদের তেহরান সফর দু'দেশের মধ্যকার চরম উত্তেজনার মাঝেও এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সউদী যুবরাজের ঘনিষ্ঠ ভাই ও আস্থাভাজন প্রতিনিধি প্রিন্স খালিদকে তেহরানে পাঠানোর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট যে, সউদী নেতৃত্ব মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার আরেকটি বিধ্বংসী যুদ্ধ এড়াতে মরিয়া। কারণ, তেমন কোনো যুদ্ধ শুরু হলে একদিকে হুথি হামলা, অন্যদিকে ইরানের সম্ভাব্য রকেট ও ড্রোন হামলার মুখে পড়তে পারে সউদী আরব।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার অংশ হিসেবে ইরান এই সফরকে তাদের বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে না পেরে গত আগস্টে 'মক্কা প্যাক্ট' স্বাক্ষর করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বিশেষ করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে পড়ে, তখন থেকেই নিজস্ব প্রতিরক্ষা বলয় তৈরির তাগিদ অনুভব করছিল তারা।
সোমবারে তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, "আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে উদ্যোগ বা আলোচনা শুরু করেছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ।" সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন