প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। গত ১৮ দিনের মধ্যে তিনটি জাহাজে হানা দিয়ে তারা মোট ১০ কোটি টাকার মালপত্র লুট করেছে। এর ফলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে বন্দর ব্যবহারকারীরা এবং আমদানিকারকরা। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের ইমেজ সংকটে পড়ারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম চেম্বার দস্যুতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
গত ১৬ জুলাই ভোরে চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’-এ জলদস্যুরা হামলা চালায়। ওই জাহাজটি হংকং থেকে সীতাকুণ্ডে জনতা স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা হয়েছিল। প্রায় ২০ জন সশস্ত্র দস্যু পাঁচটি কাঠের নৌকায় এসে হামলা চালায়।
শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন বলেন, নোঙর নিক্ষেপের সময় হামলাকারীদের একটি দল নাবিকদের ব্যস্ত রাখে এবং অন্য একটি দল ডেক থেকে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিকভাবে বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রেডিও বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দস্যুরা পালিয়ে যায়।
এর আগে ২৯ জুন চার্লি অ্যাঙ্করেজে ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিংয়ের আমদানি করা ‘এমভি হাই জু’ জাহাজে ২০ থেকে ২৫ জন সশস্ত্র ডাকাত উঠে নাবিকদের জিম্মি করে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে যায়। এর পরদিন যমুনা শিপ ব্রেকার্সের আমদানি করা ‘এমটি আইআরওএস’ জাহাজ থেকে কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়। পরে নৌ পুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালপত্র উদ্ধার করে।
প্রতিটি ঘটনায় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে, তবে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন যে তারা তাৎক্ষণিক সহায়তা পাননি।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রোবেরি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, চট্টগ্রাম বন্দরে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) কোনো ধরনের দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু হঠাৎ করে একের পর এক ঘটনায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর এবং বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থা।
চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ খালাস হয় বহির্নোঙরে। নাব্য সংকটের কারণে জাহাজগুলো সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারে না। ছোট আকারের (লাইটার) জাহাজে বেশির ভাগ আমদানি পণ্য খালাস করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ সেখানে নোঙর করে। এসব জাহাজ থেকে গড়ে দৈনিক দেড় লাখ টন পণ্য খালাস করা হয় লাইটার জাহাজে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ ভাগ পরিচালিত হয়। যদি বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় তবে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতির মুখে পড়বে। বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়বে, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচও বাড়বে। তাই আমরা জরুরি পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।
বহির্নোঙরে জাহাজে জলদস্যুতা প্রতিরোধে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, জলদস্যুতার ঘটনায় অন্তত ১০ কোটি টাকার মালপত্র, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। এছাড়া জাহাজের নিরাপত্তা ও নাবিকদের জীবনও ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে বড় জাহাজের পণ্য খালাসের দায়িত্ব পালন করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা। বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সরওয়ার হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম চার মাসে কোনো দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু হঠাৎ করে ডাকাতির ঘটনা বেড়ে গেছে বহির্নোঙরে।
লাইটার জাহাজ পরিচালনা করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল। এই সংগঠনের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, ছোট নৌকায় করে দস্যুরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বড় জাহাজে হামলা চালায়। চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে বন্দর ও কোস্টগার্ডকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বহির্নোঙরে জাহাজে চুরির অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কোস্টগার্ড। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে এ পর্যন্ত বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন), বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডারের সাথে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।সভায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর্যালোচনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যতে চুরি প্রতিরোধের করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
সভায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সাথে সমন্বয় করে বহির্নেঙরে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত করা, জাহাজের আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলক সরবরাহ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম বলেন, বহির্নেঙরে চুরি বন্ধে নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। কোস্টগার্ড টানা অভিযান চালাচ্ছে এবং চুরির সাথে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন