প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিভিন্ন ধরনের চিত্রকর্ম, ভিন্ন ধরনের ভাবনা, জীবনের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা এবং দেশে ও বিদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা—এসব কিছুর সম্মিলনে এস এম সুলতান জীবদ্দশায় কিংবদন্তিতে পরিণত হন। তার শিল্পের বিষয়বস্তু এবং জীবনদর্শন তাকে সমকালীন শিল্পীদের থেকে আলাদা পরিচয় প্রদান করেছিল।
মৃত্যুর পর তার শিল্পকর্ম এবং জীবনচর্চা স্বতন্ত্র শিল্প-আন্দোলনে আরো বিস্তৃত হয়েছে। আজকের দিন, ১০ আগস্ট, সুলতানের ১০৩তম জন্মদিন। এর আয়োজন চলছে তার জন্মস্থান নড়াইল এবং দেশের অন্যান্য স্থানে, যেখানে বাংলার মাটি ও মানুষের এই গুণী শিল্পীকে স্মরণ করা হবে।
১৯২৩ সালের এই দিনটি ছিল নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে শেখ মোহাম্মদ সুলতানের জন্ম। শৈশবকাল থেকেই পরিবারের সদস্যরা তাকে ‘লাল মিয়া’ নামে ডাকতেন। তার বাবা শেখ মেছের আলী ছিলেন রাজমিস্ত্রি। বাবার সঙ্গে নির্মাণশ্রমে যাওয়ার ফলে ভবন, মানুষের শরীর এবং শ্রমের দৃশ্য আঁকাতে তার আগ্রহ তৈরি হয়। নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পাঁচ বছরের পড়াশোনার পর তিনি বাবার কাজে যুক্ত হন।
শিল্প শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাকে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় নিয়ে যায়। স্থানীয় জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের অর্থনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে তাকে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও শিল্প সমালোচক শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তিন বছর পর সেই শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই তিনি বেরিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় তার স্বাধীনভাবে শিল্পচর্চা ও ভ্রমণের জীবন।
১৯৪৬ সালে সিমলায় তার প্রথম প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয়।
দেশভাগের পর কিছুদিন তিনি কাশ্মীরে অবস্থান করেন। ১৯৫১ সালে করাচিতে গিয়ে একটি স্কুলে শিল্পশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এর পূর্বে ১৯৫০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো ও বস্টনে তার কাজ প্রদর্শিত করেন। পরে লন্ডনেও তার ছবিগুলি প্রদর্শীত হয়।
বিশ্বশিল্পের এই বিস্তৃত পরিসর তাকে নিজের মাতৃভূমি থেকে দূরে সরাতে পারেনি। ১৯৫৩ সালে তিনি নড়াইলে ফিরে এসে চিত্রা নদীর তীরের জীবনকে তার শিল্প ও অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেন। শিশুদের জন্য শিক্ষা এবং সৃজনশীলতার পরিবেশ তৈরি করতে তিনি উদ্যোগী হন। তার শেষ জীবনে নড়াইলে ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই স্বপ্নের বাস্তবে কিছুটা রূপায়িত হয়। সুলতানের কৃষক শিল্পকর্ম বাস্তবের একটি অনুলিপি নয়, বরং তা একটি স্বপ্ন এবং সম্ভাবনার চিত্র। তার বিশাল পেশিবহুল কৃষক চরিত্রকে বাস্তবের ক্ষীণকায় কৃষক এবং জেলের বিপরীতে প্রতীকী এক স্বপ্নের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়। তবে গ্রামীণ জীবনের শোষণ, সহিংসতা এবং বঞ্চনার বাস্তবতাও তার শিল্পে অনুপস্থিত নয়। এর শক্তিশালী উদাহরণ তার আঁকা ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’ (১৯৭৫) এবং ‘চরদখল’ (১৯৭৬)। পরবর্তী সময়ে উল্লেখযোগ্য কর্ম ‘ফসল কাটা’ (১৯৮৬) এবং ‘Fishing-3’ (১৯৯১) এই শিল্পকর্মে কৃষক, শ্রম, প্রকৃতি এবং জীবনের সম্পর্ককে উপস্থাপন করা হয়েছে।
১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে তার প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দেশব্যাপী শিল্পমহলে তার কাজ নতুন আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়ে স্বীকৃতি আসে ধারাবাহিকভাবে। তার খ্যাতি শহুরে শিল্পজগতের স্থায়ী বাসিন্দা করে তুলতে পারেনি। বরং নড়াইল, চিত্রা নদী, শিশু, পশুপাখি এবং সাধারণ মানুষকে ঘিরে থেকেছে তার জীবন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন