প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খুলনা অঞ্চলে প্রায় ৯ মাস ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে কাঁচাপাট রপ্তানি। রপ্তানিকারকরা দাবি করেছেন যে, কাঁচাপাটকে শর্তসাপেক্ষ রপ্তানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকেই সংকট শুরু হয়েছে। তাই বিপুল পরিমাণ পাট গোডাউনে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, এবং এর মান ও বাজারমূল্য কমছে। একদিকে, ব্যবসায়ীদের লোকসান বাড়ছে, অন্যদিকে হাজারো শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন।
খনার দৌলতপুর, খানজাহান আলী ও আশপাশের এলাকার পাট গোডাউনের পরিস্থিতি ভিন্ন। সেই সময়ে যখন শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর জন্য কাঁচাপাট বাছাই, প্রেসিং ও বেইলিংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, তখন গোডাউনগুলো এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন যে, কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হাজার হাজার মণ পাট মাসের পর মাস ধরে গোডামে মজুত রয়েছে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণে থাকার কারণে অনেক পাটের মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাঁচাপাটকে শর্তসাপেক্ষ রপ্তানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে খুলনা অঞ্চলে রপ্তানি কার্যকরীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসহ বিভিন্ন জটিল প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। সংকট সমাধানের দাবিতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে তারা একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছেন, তবে কার্যকর কোনো সমাধান এখনো আসেনি।
গাজী জুট ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী গাজী শরীফুল ইসলাম বলেছেন, রপ্তানি বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ পাট গুদামে আটকে রয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে যাচ্ছে, গুদামভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে চরম সংকটে রয়েছেন। দ্রুত রপ্তানি চালু না হলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মো. আলমগীর খান বলেছেন, কাঁচাপাট রপ্তানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাত। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই খাত অচল থাকার ফলে ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমিক—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
রপ্তানি বন্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, খুলনা অঞ্চলের প্রায় ২০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। কাজ না থাকায় অনেক শ্রমিক বিকল্প পেশার খোঁজ করছেন।
দৌলতপুরের শ্রমিক আব্দুল গফ্ফার বলেছেন, আগে সপ্তাহে ছয় দিন নিয়মিত কাজ করেছি। এখন মাসে কয়েকদিনও কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় ধারদেনা করতে হচ্ছে। আরেক শ্রমিক মো. সোহেল রানা বলেছেন, পাট প্রেসিং ও লোডিংয়ের কাজ করেই পরিবারটি চলছিল। কাজ না থাকায় আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়িভাড়া, বাজার খরচ ও চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত রপ্তানি চালু না হলে শ্রমিকদের মানবেতর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে। শ্রমিক রহিমা বেগম বলেছেন, আমাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে বললেই চলে। সন্তানদের লেখাপড়া, খাবার ও পরিবারের অন্যান্য খরচ ঠিকভাবে বহন করতে পারছি না। অনেক নারী শ্রমিক এখন বিকল্প কাজের খোঁজ করছেন, তবে সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।
দৌলতপুর জুট প্রেস অ্যান্ড বেইলিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিঠু বলেছেন, ‘শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা এখন বিপদের সম্মুখীন। কয়েক দফা আন্দোলন করেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সমাধান আসেনি। দ্রুত রপ্তানি চালু না হলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে এবং সামাজিক সংকটও তৈরি হতে পারে। দ্রুত যদি সরকার আমাদের কর্মের ব্যবস্থা না করে, তাহলে আরও বড় আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।’
যদিও পাট অধিদপ্তর বলছে, সমস্যা সমাধানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। খুলনা পাট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরজিৎ সরদার বলেছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর কাজ করছে। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের উদ্বেগের বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। আমরা দ্রুত ইতিবাচক সমাধানের আশা করছি।’
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খুলনা অঞ্চল থেকে ৩৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছিল। অথচ চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু রপ্তানিকারক নয়, কৃষক, শ্রমিক ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন