প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পদ্মা ও যমুনা নদীর অববাহিকায় পানির স্তরের বৃদ্ধি ঘটার ফলে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের দুর্গম চরাঞ্চলে ভয়াবহ নদী ভাঙ্গনের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে প্রতিদিন বসত বাড়ি এবং জমিজমা বিলীন হয়ে যাচ্ছে, ফলে হরিরামপুরের মানচিত্র ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। অনেক স্থানে পূর্বপুরুষের শেষ চিহ্ন কবরগুলোও পদ্মার পেটে চলে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে হরিরামপুরের কয়েক হাজার পরিবার।
এ বিষয়ে জানা যায়, এই উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে নয়টি ইউনিয়ন পদ্মা ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। এর মধ্যে আশির দশক থেকে আজিমনগর, সুতালড়ি ও লেছড়াগঞ্জ তিনটি ইউনিয়ন সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে গেছে। নব্বই দশকের শেষ দিকে তিনটি ইউনিয়ন পুনরায় জেগে উঠলে সেখানে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং কৃষি বিপ্লব শুরু হয়। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হয় এই চরমচলের তিনটি ইউনিয়নে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করার কারণে প্রতিবছর এই চরাঞ্চলে ভয়াবহ ভাঙ্গনে ফসলি জমি পদ্মার পেটে চলে যাচ্ছে। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া এলাকার কবির মোল্লার ছেলে জীবন মোল্লা জানান, “বাড়িঘর, জমিজমার সাথে এবার আমাদের পূর্বপুরুষের কবরটিও পদ্মা নদীর পেটে চলে গেল। চরাঞ্চলের পদ্মার তীব্র ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমির পাশাপাশি এবার বিলীন হয়েছে আমার পিতামহ (বাবার দাদা) মাঈন উদ্দীন মোল্লার কবরও।” তিনি আরও বলেন, “দেড় যুগ ধরে যে কবরটি তাঁর বাবা, চাচা ও দাদার কাছে ছিল স্মৃতি ও আবেগের জায়গা, নদীভাঙনে সেটিও এখন আর নেই।”
স্থানীয়দের দাবি, বিগত ৪-৫ বছর ধরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দুই হাজারের মতো বসতবাড়ি এবং হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি। তারা জানান, হরিহরদিয়া, সেলিমপুর, জয়পুর ও হালুয়াঘাটসহ আশপাশের এলাকায় ভাঙনে এ বছর শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। গত ৪-৫ বছরে চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ, সুতালড়ি ও আজিমনগর ইউনিয়নে আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪ তলা ভবন, হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কয়েকটি স্কুল ও বাজারসহ হাজার হাজার বাড়িঘর পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে।
হরিহরদিয়া এলাকার হরিহরদিয়া কিন্ডারগার্টেনের কর্ণধার রাজিব হোসেন বলেন, “সেলিমপুর গতবছর শেষ করেছে পদ্মা। এবার বর্ষায় জয়পুরে ১৫০টির মতো বাড়ি নদীতে চলে গেছে। মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। যারা আগে জমিজমার মালিক ছিলেন, এখন তাদের অনেকেরই থাকার জায়গা নেই।” তিনি আরও জানান, লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের পাশাপাশি ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নেও ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে।
হালুয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, “আমাদের ঘরবাড়ি ও জমি কয়েক বছর আগে নদীতে গেছে। এখন আবার হালুয়াহাট এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। হরিণাঘাট এলাকায় গত বছরও ভয়াবহ ভাঙন ছিল। এ বছরও শুরু হয়েছে। চরাঞ্চলে পদ্মা ভাঙন ঠেকাতে কেউ কাজ করে না।”
আজিমনগর ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা নাসির উদ্দীন জানান, কয়েক বছরে আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় ৪ তলা ভবনসহ তেঘাটা আশ্রম প্রকল্প বিলীন হয়ে গেছে।
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নং ওয়ার্ড সদস্য মোতালেব হোসেন বলেন, “লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ভাঙতেছে। দ্রুত বস্তা ফেলা না হলে চর থাকবেনা। খাদ্য মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা মহোদয় বিমান মন্ত্রী থাকাকালে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের সেলিমপুর- হরিহরদিয়া ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ে ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি বলে শুনলাম।”
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “চরের মানুষ অসহায়। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নসহ চরাঞ্চল পদ্মা ভাঙনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন আর তেমন কিছুই নেই। ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নটাখোলা পুলিশ ফাঁড়ি ও নটাখোলা আফরোজা উচ্চ বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।”
স্থানীয়রা বলছেন, চরাঞ্চলে কয়েক বছর ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও নদীতীর রক্ষায় স্থায়ী বা অস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষ।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান ইনকিলাবকে জানান, চরাঞ্চলের ভাঙ্গনের বিষয়টি শুনে আজ (সোমবার) মানিকগঞ্জ-২ আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত ও উপজেলা প্রশাসনসহ চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে ভাঙন কবলিত এলাকা ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে যাচ্ছি। পরিদর্শন শেষে বিস্তারিত আপনাকে জানাতে পারবো।” তিনি আরও জানান, এ ছাড়াও হরিরামপুরের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙ্গন রোধে আপদকালীন প্রকল্পে একাধিকবার জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে। তবে আগামী বছরের মধ্যে এই হরিরামপুরে ১২ কিলোমিটার এরিয়া নিয়ে স্থায়ী বেরিবাঁধেরও একটা প্রক্রিয়া চলছে।
উল্লেখ্য, ৫০ দশক থেকে এ উপজেলায় অনবদ্য পদ্মা ভাঙ্গন দেখা দেয়। এর ফলে দিনে দিনে এ উপজেলার ভৌগলিক অবস্থান অনেকটাই ছোট হয়ে আসছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন