প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত উপজেলা হালুয়াঘাটের খন্দকপাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক মো. রফিক মিয়া (৫৫) উচ্চ রক্তচাপের রোগী। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নারের নিয়মিত ফলো আপে আসেন এবং প্রাপ্যতা সাপেক্ষে এক মাস করে ঔষধ নিয়ে যান। তিনি উল্লেখ করেন, "আগে এমন কোনো সেবা পাইনি আমরা, রক্তচাপ পরিমাপের নির্দিষ্ট কোনো কক্ষ বরাদ্দ ছিল না। কিন্তু এখন নিয়মিত এনসিডি কর্নারে এসে রক্তচাপ মাপাতে পারেন এবং ডাক্তার ও নার্সের পরামর্শে ঔষধ সেবন করেন।"
বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষের আয়ু বাড়ছে, জীবনযাত্রা ক্রমেই কম কায়িক পরিশ্রম নির্ভর হচ্ছে, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে এবং দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামনে আসছে আরেকটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি, যেটি অসংক্রামক রোগ বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি)। দেশের জনসংখ্যার মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। এর মধ্যে শতকরা ৩৪ ভাগই হৃদরোগ ও স্ট্রোক জনিত কারণে ঘটে। এই বাস্তবতায় উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি সেবা জোরদার করার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০১৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউণ্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভ’ পরিচালিত হয়ে আসছে। এর আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাঠামোবদ্ধ সেবা জোরদারের কাজ চলছে। রোগীদের নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা, চিকিৎসা অনুযায়ী ঔষধ গ্রহণ, জীবনাচারণ পরিবর্তন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফলোআপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে হৃদরোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পরিবর্তে হৃদরোগ ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কার্যক্রম পরিচালনায় বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঔষধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। উচ্চ রক্তচাপের একজন রোগীকে দীর্ঘ সময়, অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন, নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় ঔষধের সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে রোগীর চিকিৎসা ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এনসিডি কর্নারে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, রোগীকে শুধু শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; তাকে প্রয়োজনীয় ঔষধ, পরীক্ষা, চিকিৎসা পরামর্শ এবং নিয়মিত ফলোআপের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
এনসিডি সেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত জনবল। এনসিডি কর্নারগুলোকে 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস' সেন্টারে রূপান্তরের কথা বলা হলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ জনবল না থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় এনসিডি কর্নারে রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত মানের নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাকির হোসাইন জানান, উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোগীরা তাদের নিজ এলাকার কাছাকাছি নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন। তবে এনসিডি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে কিছু বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সর্বশেষ ২০২৫ সালের শেষের দিকে ন্যাশনাল প্রোটোকল অনুসারে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পাঁচ ধরণের সরকারি ঔষধ বরাদ্দ পেয়েছে যেগুলো প্রায় শেষের দিকে। এনসিডি কর্নারে পর্যাপ্ত ঔষধ না থাকলে এনসিডি কর্নারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ময়মনসিংহ জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. ফখরুল হাসান চৌধুরী জানান, ময়মনসিংহ জেলার আওতায় এখন প্রায় ৩৪ হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগী এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। এই কার্যক্রমকে সামনে আরও ভালোভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন মেডিসিন সরবরাহ থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন। এছাড়াও ঔষধের পাশাপাশি রোগীদেরকে স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে জোরদান করেন তিনি।
ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা জানান, এখন অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের এমএসআর ফাণ্ড ব্যবহার করে ওষুধ ক্রয়ের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এমএসআর ফাণ্ডের মাধ্যমে ইনডোরসহ অন্যান্য অনেক কিছু ক্রয় করার কারণে প্রোটোকল অনুসারে পর্যাপ্ত ঔষধ ক্রয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা। তাই এনসিডি ঔষধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ময়মনসিংহ জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ভীষণভাবে উপকৃত হবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
বিশ্ব হার্ট দিবসে যখন সারা বিশ্ব হৃদস্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছে, তখন বাংলাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর এনসিডি কর্নারগুলো সেই বার্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন