০২:০০ পি.এম
নেত্রকোণা, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ : মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং প্রাকৃতিক প্রভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তন অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। যদিও ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহরের অতিরিক্ত ব্যস্ততায় ষড়ঋতুর ধারাবাহিকতা কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে, তবুও হাওরাঞ্চলের গ্রামবাংলায় ছয়টি ঋতুর নিজস্ব ছন্দ আজও অটুট রয়েছে। কার্তিকের শুরুতে, ঋতুচক্রের চতুর্থ ঋতু হেমন্ত শান্ত, স্নিগ্ধ ও অপরূপ ক্যানভাস রচনা করেছে।
নেত্রকোণা সদর উপজেলার পশ্চিম উলুয়াটি, কয়রাটি গ্রাম এবং আশপাশের বিস্তৃত জনপদে এখন হেমন্তের ভোরের কুয়াশা ঘেরা মেঠোপথ, শিশিরস্নাত ধানের শীষ এবং সোনালি রোদে এক অসাধারণ জীবনকাব্য রচিত হচ্ছে।
হেমন্তের এই সময়ে গ্রামীণ জীবনের সূচনা ঘটে ফজর নামাজের মাধ্যমে। নামাজ শেষে প্রতিটি গৃহস্থবাড়িতে শুরু হয় চিরচেনা ব্যস্ততা। মায়েরা ভোরের প্রথম প্রহরে হাঁস-মুরগির খোঁয়াড় খুলে তাদের ছেড়ে দিয়ে নতুন দিনের গৃহস্থালি কাজের শুভসূচনা করেন।
আরও পড়ুন: দুদকের মামলায় মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, পরিবার বলছে ‘মৃত্যু নিয়ে তামাশা’
অন্যদিকে, হেমন্তের এই সময় কৃষকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির ও অবসরের। রোপা আমন ধানের শীষ আসা শুরু হয়েছে, ফলে কৃষকরা মেহনতের ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। রোদ উঠতে শুরু করলেই তারা খেতের আগাছা পরিষ্কার করা কিংবা আইলে বসে নিজেদের মধ্যে মেঠো গল্পে সাময়িক স্বস্তির মুহূর্ত কাটান।
হেমন্তকালীন সময়ে প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে পাখিদের কলকাকলিও বদলাচ্ছে। যদিও গ্রামে কাকের উপস্থিতি অনেকটাই কমে এসেছে, কিন্তু তার স্থান পূরণ করে দিচ্ছে ছোট দোয়েল, ফিঙে, ময়না ও বাতালিকসহ বিভিন্ন পাখির মিষ্টি গুঞ্জন। উঁচু গাছের মগডাল থেকে ভেসে আসে ডাহুকের ডাক, আর বিল-ঝিল বা খেতের আইলে উড়ে আসে সাদা বক ও গৃহপালিত কবুতর।
গ্রামের কর্মজীবী মানুষেরা ভোরের সময়টাকে খুব সুন্দরভাবে কাজে লাগান। সারাদিন কাজের প্রয়োজনে বাইরে থাকতে হয় বলে সকালের এই শান্ত প্রহরেই তারা অনেক গৃহস্থালি কাজ সেরে নেন। ভোরের নরম কাঁচা রোদের আমেজ গায়ে মেখে ছোট ছোট শিশুরা মক্তব বা প্রাইমারি স্কুলের দিকে রওনা দেয়। একই সাথে মেঠোপথ ধরে বয়ে চলা ভ্যান ও বাইসাইকেলের টুংটাং শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রামের আঁকা বাঁকা মেঠোপথ।
হেমন্তের এই সময় আবহাওয়ার বৈচিত্র্য প্রতিটি ধাপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দিনে হালকা রোদের আমেজ থাকলেও সূর্য ডুবলেই হিমেল নীরবতা নেমে আসে। শেষরাতে ঘরের ভেতর বৈদ্যুতিক পাখা বন্ধ রেখে গায়ে জড়াতে হয় হালকা নকশীকাঁথা। সকালে পাখার সুইচ বন্ধ রেখে সুকোমল শান্তিতে ঘুমানোর এই আবহ কেবল গ্রামবাংলার হেমন্তেরই এক অনন্য মাধুর্য।
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে জেলা পরিষদের পক্ষে ৫৩ টি পূজা মণ্ডপে চেক বিতরণ
ভোরের পূবের আকাশে যখন কুয়াশার পাতলা পর্দা ভেদ করে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করে, তখন প্রকৃতির প্রতিটি কোণায় এক নতুন সম্ভাবনার শুভ উদয় ঘটে। দিগন্তজোড়া আমন খেতের সবুজ পাতার চূড়ায়, মেঠোপথের ধারে কচি দুর্বাঘাসে এবং কচু পাতায় মুক্তোর দানার মতো জমে থাকে হেমন্তের শিশিরবিন্দু। খেতের ঝোপঝাড়ে বোনা মাকড়সার জালে আটকে থাকা হাজারও শিশিরকণা ভোরের আলোয় মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে, যা শীতের আলতো আগমনী বার্তা ঘোষণা করে। মাটির কাঁচা রাস্তার দুপাশে বেড়ে ওঠা ভাঁটগাছগুলোও শিশিরস্নাত হয়ে নীরব প্রস্তুতি নিচ্ছে শুভ্র ভাঁটফুলে প্রকৃতির রূপসী সংসার সাজাবে বলে। আর ভোরের সেই কচি ঘাসের বুকে জমে থাকা রাতভরের শিশির খালি পায়ে মাড়ানোর ভেতর গ্রামবাসী ও পথচারীরা খুঁজে পান এক অদ্ভুত সুখানুভূতি।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জমে ওঠে মেঠোপথের জীবন। মেঠোপথের দুপাশের সবুজ ধানের খেত এবং পাশের ডোবায় ফুটন্ত বেগুনি কচুরিপানার ফুলগুলো যেন একলা কোনো পথিকের অপেক্ষায় প্রহর গুনে। কৃষকেরা যেমন ছুটে যান ধানের খেত দেখতে, তেমনি গবাদিপশুর জন্য কাঁচি ও খাঁচা নিয়ে শিশিরভেজা কচি ঘাস কাটতে বের হন অনেকে। কেউবা আবার জাল ও ছুকড়া (মাছ রাখার জন্যে বাঁশের তৈরি পাত্র) নিয়ে ছোটেন বিলের জলে ভেসে থাকা কচুরিপানা ফুলের ভিড়ে মাছ শিকারের আশায়। আইল ধরে হাঁসের পাল নিয়ে হেঁটে যাওয়া এবং পাখির কলকাকলিতে ভরপুর নেত্রকোণার প্রাত্যহিক এই জীবন যেন জানান দিচ্ছে—বাঙালির প্রাণের গ্রামে ঋতুচক্র আজও একই মহিমায় জাগ্রত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন