প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, শিশুর হেফাজত বা জিম্মা সংক্রান্ত পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে যদি আপিলের স্পষ্ট সুযোগ থাকে, তাহলে হাইকোর্টে সরাসরি হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। এক গর্ভধারিণী মায়ের দায়ের করা হেবিয়াস করপাস রিটের রুল খারিজ করে বিচারকদ্বয় এই সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।
বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এই রায় দেন। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২১ পৃষ্ঠার রায়ের মূল অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি কাজী জিনাত হক রায়ের মূল অংশটি লেখেন।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন ও আইনজীবী প্রিন্স আল মাসুদ। বিবাদী পক্ষে (বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক দম্পতি) ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফৌজিয়া করিম ফিরোজ ও আইনজীবী কাজী মারুফুল আলম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. গোলাম রহমান ও নূর মোহাম্মদ আজমী। ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. লুৎফর রহমান।
মামলার পটভূমি
প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুরের এক পোশাক কারখানার শ্রমিক মো. জসিম উদ্দিন ও রোজিনা আক্তার দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান (বাসমিন আবরাব) ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাভারের একটি হাসপাতালে জন্ম নেয়। পরে শারীরিক জটিলতার কারণে শিশুটিকে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রিটকারীর দাবি, সে সময় দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সহিংসতা ও কারফ্যু পরিস্থিতির কারণে অর্থ জোগাড় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তারা সাময়িকভাবে হাসপাতাল ত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরে হাসপাতালের বকেয়া বিলের জন্য ৮-৯ লাখ টাকা দাবি করা হলে তারা গ্রামে গিয়ে ভিটেমাটি বিক্রির চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তেজগাঁও থানায় একটি জিডি করে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে আজিমপুর ছোটমনি নিবাসে হস্তান্তর করে। সেখান থেকে একতরফা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক দ্বৈত নাগরিক (বাংলাদেশি-যুক্তরাজ্য) পরিবার ঢাকার পারিবারিক আদালত থেকে শিশুটির অভিভাবকত্ব ও জিম্মা লাভ করে। সন্তানকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পরে শিশুটির মা রোজিনা আক্তার হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট দায়ের করেন।
অন্যদিকে বিবাদী পক্ষ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পিতা-মাতা শিশুটিকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ফেলে রেখে গিয়ে আর যোগাযোগ করেননি, যা সন্তানকে ‘পরিত্যাগ’ করার শামিল। তাই বাধ্য হয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় শিশুটিকে উদ্ধার ও পরবর্তীতে আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে দত্তক/জিম্মা প্রদান করা হয়।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ
রিট আবেদন ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, পিতা-মাতা সন্তানকে স্বেচ্ছায় ‘পরিত্যাগ’ করেছিলেন নাকি রাজনৈতিক সংঘাত ও আর্থিক অনটনের কারণে সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করেছিলেন-এটি একটি জটিল ও বিতর্কিত বিষয়। রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত শুনানিতে এ ধরনের বিতর্কিত বিষয়ের সত্যতা নিরূপণ সম্ভব নয়।
হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ দেন, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী পারিবারিক আদালতের যেকোনো ডিক্রি বা নির্দেশের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিলের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। যেখানে বিশেষায়িত আইন ও আপিল ফোরাম বিদ্যমান, সেখানে সরাসরি হাইকোর্টে রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করা অনুচিত।
এই আইনি পর্যালোচনার ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ রিট আবেদনের ওপর জারি করা রুল খারিজ করে রায় দেন এবং পূর্বের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাতিল করেন। তবে রায়ে স্পষ্ট করা হয় যে, গর্ভধারিণী মা তার সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব পাওয়ার জন্য আইনসম্মত বিচারিক ফোরামে আইনগত প্রতিকার চাইতে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন