১১:২৬ এম
দেশের ব্যাংকগুলো খেলাপি কমানোর লক্ষ্যে ঋণের পুনঃতফসিল বৃদ্ধির কাজ শুরু করেছে। গত বছর ব্যাংকগুলো ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিল সুবিধা প্রদান করেছে।
এই ফলে ব্যাংক খাতে গত বছর শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।
এর আগে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত 'ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫'-এ এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সংবাদটি আমার দেশ প্রকাশ করেছে।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় শিক্ষার্থী নিহত, সড়ক অবরোধ
গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সর্বাধিক খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিল করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ২০২১ সালে ১২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে।
২০২২ সালে ৪৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৭৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে ৫৯ হাজার ৯২০ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৯৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা পুনঃতফসিল হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতের পুনঃতফসিল করা ঋণের ৫৭ শতাংশ শীর্ষ ১০ ব্যাংকে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রতিবছর খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে খেলাপি ঋণ কমানো লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের জুলাই মাসে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের পুরো ক্ষমতাই ব্যাংকগুলোর হাতে স্থানান্তরিত হয়। এরপর থেকে খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, কারণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিজস্ব সিদ্ধান্তে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা আসার প্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোকে ঋণ নিয়মিত রাখতে পুনঃতফসিলের সুবিধা প্রদান করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। বিগত সরকারের সময় নীতিমালাও শিথিল করা হয়েছিল, ফলে মাত্র আড়াই থেকে সাড়ে চার শতাংশ টাকা জমা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের স্বীকারোক্তি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট, যুবক আটক
ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সমস্যায় পড়েছে বা মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুবিধা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন কিছু নীতিমালা সৃষ্টি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাত্র দুই শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়। এ ঋণের মেয়াদ সর্বাধিক ১০ বছর এবং ঋণ নিয়মিত হলে প্রথম দুই বছর ঋণ পরিশোধে বিরতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রথম দফায় গত বছরের জুন পর্যন্ত যেসব গ্রাহক খেলাপি ছিলেন, তাদের জন্য এই সুবিধা দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই সময়সীমা বৃদ্ধি করে নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ গত মাসে এক সার্কুলারে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আবার বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জানা গেছে, নীতি-সহায়তার আওতায় এক হাজার ৫১৬টি আবেদনের বিপরীতে এক লাখ ৯৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৩০০টি গ্রুপের ৯০০টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো ২৫০টি ঋণ আবেদন বাস্তবায়ন করেছে। এর মাধ্যমে ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ৪০% আবার খেলাপি হয়ে গেছে। ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, তার মধ্যে ৩৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ঋণ খেলাপির খাতায় হিসাব করা হয়েছে। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ বলে, গত বছরের শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। এই ঋণের মধ্যে এক লাখ ৭৮ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা আবার খেলাপির আওতায় এসেছে।
আরও পড়ুন: ৩৫টি বিমান কেনার সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে কি না?
এছাড়া পুনঃতফসিলকৃত খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা, যা মোট পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ৬০ দশমিক ১৩ শতাংশ।
আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উৎপাদনশীল খাতের উদ্যোক্তারা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। ২০২৫ সালের শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতির মধ্যে ২৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ ছিল শিল্প খাতের। দ্বিতীয় স্থানে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত, ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
তাছাড়া, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ১৩ দশমিক ০৫ শতাংশ চলতি মূলধন, আমদানিতে ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যিক ঋণে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ নির্মাণ, ৩ দশমিক ০১ শতাংশ কৃষি খাতে, জাহাজ নির্মাণে ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ অন্যান্য খাতে।
ব্যাংক খাতে 'স্ট্রেসড' বা 'দুর্দশাগ্রস্ত' হিসেবে পুনঃতফসিলকৃত ঋণ জামানত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
আরও পড়ুন: মজুরি বোর্ড গঠনে সন্তুষ্ট, সাভার-আশুলিয়ার শ্রমিকরা কাজে ফিরছেন
একই সময় পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। আর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় ব্যাংকগুলো ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার ঋণ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন