প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং দেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে অঞ্চলটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছেন।
বুধবার মিসর সফরের সময় শি চিনপিং এসব মন্তব্য করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মাঝে চীন যখন এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন তার এই বক্তব্য প্রকাশিত হলো। এটি শি চিনপিংয়ের চার বছরের মধ্যে প্রথম মধ্যপ্রাচ্য সফর। চলমান সংঘাতের কারণে এ অঞ্চলের বাণিজ্য ও অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি পুনঃমূল্যায়ন করছে।
মিসর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে একটি। প্রতিবছর দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিসর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও সম্পর্ককে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে মিসর। বুধবার কায়রোতে সামরিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শি চিনপিংকে স্বাগত জানান মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। এরপর শি চিনপিং মন্তব্য করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিজেদের ভবিষ্যৎ ও ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা উচিত। তিনি অঞ্চলটির জন্য নতুন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া তার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে। শি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন প্রস্তুত। হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা এখন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিনহুয়া জানায়, শি চিনপিং ও আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির বৈঠকে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
দুই দেশের নেতারা সন্ত্রাসবাদ দমনে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তথ্যকেন্দ্র, ছোট বৈদ্যুতিক চিপ এবং গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর সরবরাহব্যবস্থায় দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একে অপরের মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ সম্মত হয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি মিসরের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনার একটি বড় পরিকল্পনার অংশ। সফরের আগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রেসিডেন্ট সিসি বলেন, বিশ্বজুড়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মিসর ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
সাবেক মিসরীয় কূটনীতিক আইমান জেইনেলদিন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও বাড়াতে চায় মিসর। দুই দেশের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মিল থাকার কারণে সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক ভূমিকা আরও বাড়াতে চায় বেইজিং। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে চীনের। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, চীনের কাছে মিসর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটির বড় অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মিসরের উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতেও মিসরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মিসরের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চীন ও মিসরের সম্পর্ক শুধুমাত্র অর্থনীতি ও কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত মাসে মিসর ও চীন যৌথভাবে ‘সভ্যতার ঈগল’ নামে একটি সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। এতে দুই দেশের বাড়তে থাকা সামরিক সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মহড়ায় বিরল একটি বিমানযুদ্ধের অনুশীলনও করা হয়। এতে চীনের তৈরি জে-১৬ যুদ্ধবিমান এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান অংশ নেয়।
শি চিনপিংয়ের সফরকে কেন্দ্র করে কায়রোতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কয়েক দিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চীনের পতাকা টানানো হয়। দুই দেশের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে মিসরের স্ফিংক্স ও চীনের মহাপ্রাচীরসহ দুই দেশের বিখ্যাত স্থাপনাগুলোর ছবি দিয়েও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সাজানো হয়। মিসরের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে অর্থনীতি। দেশটিতে ১১ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করে। একই সঙ্গে সুয়েজ খাল থাকায় বৈশ্বিক বাণিজ্যেও মিসরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। চীনের জন্যও মিসর একটি বড় বাজার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মিসর প্রায় ১০০ কোটি ডলারের চীনা পণ্য আমদানি করেছে। ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট সিসির চীন সফরের সময় দুই দেশ কৌশলগত অংশীদারির চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর থেকে মিসরে চীনের বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে।
চীনের বিভিন্ন কোম্পানি মিসরে কনটেইনার বন্দর, সবুজ হাইড্রোজেন প্রকল্প এবং লোহার পাইপ, গাড়ির টায়ার ও কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরির কারখানায় কয়েক শ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। মিসরের মন্ত্রিসভা জানিয়েছে, সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীন প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। বুধবার মিসর সরকার ওই অঞ্চলে চীনের তৈরি শিল্প এলাকা আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া চীনের জেডসি রাবার গ্রুপ ৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে মিসরে একটি টায়ার কারখানা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফর এবং নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে মিসরের সঙ্গে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন