প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
॥ আবু মোশাররফ ॥
চট্টগ্রাম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে মশকনিধনের উদ্দেশ্যে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। কিছু স্থানে ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, আবার অন্যত্র এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল খুঁজে ধ্বংস করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ব্যস্ত রয়েছেন। মেয়র সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করছেন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতও কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
শুধু সিটি কর্পোরেশন বা জেলা প্রশাসন নয়; শহরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি, জাতীয়তাবাদী যুবদলসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও। তবুও ‘মশার শহর’ চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর দৌরাত্ম্য থামছে না। একদিকে মশা মারার যুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, শরতের থেমে থেমে বৃষ্টির ফলে জমে থাকা পানি এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে এডিসের প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের শুরুতে সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম থাকলেও জুলাই মাস থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে যায় এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে সেই ঊর্ধ্বগতি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৩ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আক্রান্তের বড় অংশ বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে আসছে। আগস্ট মাসে চট্টগ্রামে ১ হাজার ২০২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৮৩ জনে। ১৪ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় ৭৯ জন নতুন আক্রান্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৬২ জন।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর একদিনে আরও ৮৬ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মাস শেষ হওয়ার আগেই আগস্টের তুলনায় সংক্রমণের গতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্প্রতি বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর থেকে নগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ মশকনিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংসের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
১২ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী তিন মাসের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’ এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ওই দিন চসিক ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায়। মেয়র নিজে ঝাড়ু হাতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেন এবং ফগার মেশিনে মশকনিধনের ওষুধ ছিটানো হয়। শুধু নগর নয়, জেলার প্রায় দুই হাজার মসজিদ প্রাঙ্গণে একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন, এ কাজে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।
নানামুখী উদ্যোগের মধ্যে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, আগ্রাবাদ মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতালসহ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৭৮-এ পৌঁছেছিল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর ছিল এবং অনেক রোগী রক্তক্ষরণজনিত লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। এর কয়েক দিন পর আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। ১০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ইউনিটের ৪০টি শয্যার বিপরীতে ৭১ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকার কথা জানানো হয়। অতিরিক্ত রোগীদের কেউ কেউ ওয়ার্ডের মেঝেতেও চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
শহরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় এরই মধ্যে চসিক জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট সেল চালু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। সেই জায়গাটি এখন চট্টগ্রামের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এডিসের প্রজননস্থল যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ মশা নিধনের অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও নতুন মশা তৈরি হবে। ফলে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, ফগিং এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান চললেও সংক্রমণের মূল চক্র পুরোপুরি ভাঙবে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজ বাসসকে বলেন, ‘আমরা নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে নিয়মিত মশকনিধকে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। আমি নিজে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করছি, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমরা ডেঙ্গুতে আর কোনো মৃত্যু দেখতে চাই না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরবাসীকেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তাই বাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না; নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি বাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
পরিবেশ পরিষ্কার রাখা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার একার দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। পরিচ্ছন্নতাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।’
চট্টগ্রামে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন স্থানে জমে থাকছে। আর এসব জমে থাকা পানিই এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান। তিনি আজ বাসসকে বলেন, আক্রান্তের হার বাড়ার পেছনে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণের প্রবণতা থাকার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, চলতি বছর এখন পর্যন্ত মারা যাওয়া ১৪ জনের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সব বয়সী রয়েছেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জনের মধ্যে সাতজন নারী, তিনজন পুরুষ ও দুইজন শিশু ছিলেন। এরপর আরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২৬ বছর বয়সী এক গর্ভবতী নারী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান। তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল গত ৬ সেপ্টেম্বর। অবস্থার অবনতি হলে তাকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর পাহাড়তলী এলাকার চার বছর বয়সী তাসমিন নামে এক শিশুর মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু সিনড্রোমে তার মৃত্যু হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন