প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে আসছে। এর ফলে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অগভীর ও হস্তচালিত নলকূপে পানি উঠছে না। কিছু কিছু জায়গায় নলকূপ অকেজো হয়ে গেছে। এই অবস্থায় নিরাপদ খাবার পানির জন্য মানুষের ওপর গভীর নলকূপ ও সাবমার্সিবল পাম্পের নির্ভরতা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, শুকনো মৌসুমে পানির সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। নতুন গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য আগের তুলনায় অনেক গভীরে যেতে হচ্ছে। এতে নলকূপ স্থাপনের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাবুগঞ্জ উপজেলায় ৩ হাজার ২০৬টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ১২৩টি বর্তমানে অচল অবস্থায় রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে অচল নলকূপের সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় বেশি। বিভিন্ন এলাকায় গভীর নলকূপ থাকলেও সেগুলোতেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাবুগঞ্জে নতুন একটি গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য প্রায় ৮৪০ থেকে ৯২০ ফুট পর্যন্ত গভীরে যেতে হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে নলকূপের গভীরতা বাড়াতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বাবুগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. সুমন বলেন, বর্ষা মৌসুমে পানির ফ্লো থাকায় নলকূপে কিছুটা স্বাভাবিকভাবে পানি পাওয়া যায়। কিন্তু শুকনো মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট দেখা দেয়।
তিনি আরও জানান, বাবুগঞ্জের পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ তুলনামূলক কম। তবে কিছু এলাকায় পানির গুণগত মান নিয়ে সমস্যা রয়েছে। নিয়মিত পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পানির উৎস চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আর্সেনিক ঝুঁকি নিরসন প্রকল্পের আওতায় বাবুগঞ্জ উপজেলার ১১ হাজার ৫৫৩টি গভীর ও অগভীর নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরীক্ষায় বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত অনেক অগভীর নলকূপের পানিতে উচ্চমাত্রার আর্সেনিক পাওয়া গেছে। তাই শুধুমাত্র নলকূপ থাকলেই তার পানি নিরাপদ, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগে অনেক এলাকায় অল্প গভীরতায় নলকূপ স্থাপন করেই পানি পাওয়া যেত। বর্তমানে একই এলাকায় নতুন করে নলকূপ স্থাপন করলেও আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে গভীর থেকে পানি তুলছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও শুকনো মৌসুমে বাবুগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। তখন অনেক হস্তচালিত নলকূপে পানি ওঠে না। বিশেষ করে অগভীর নলকূপে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় মানুষকে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, অনেক পরিবার অর্থের অভাবে গভীর নলকূপ বা সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করতে পারছে না। ফলে নিরাপদ খাবার পানির সংকট তাদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০ হাজারের বেশি নলকূপ, নেই পূর্ণাঙ্গ হিসাব
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাবুগঞ্জ উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে গভীর ও অগভীর নলকূপের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি। তবে এ সংখ্যা সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্থাপিত বিপুলসংখ্যক নলকূপের সঠিক হিসাব না থাকায় উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মোট পরিমাণও নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তরের ওপর চাপ বাড়তে পারে। অগভীর নলকূপে পানি না ওঠার কারণ হিসেবে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পানির ব্যবহার ও উত্তোলনের ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
বড় প্রতিষ্ঠানেও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার
বাবুগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়। বরিশালের দক্ষিণাঞ্চলের বিমানবন্দর, বিমান বাহিনীর রাডার স্টেশন, বরিশাল ক্যাডেট কলেজ এবং অমৃত কনজিউমার ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো স্থানে বড় ব্যাসের পাইপ ব্যবহার করে গভীর থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এসব উৎপাদক নলকূপের পাইপের ব্যাস ছয় থেকে আট ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে।
সাধারণ হস্তচালিত নলকূপের তুলনায় এসব নলকূপে একসঙ্গে অনেক বেশি পানি উত্তোলন করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত নলকূপের সংখ্যা, পানি উত্তোলনের পরিমাণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে পৃথক সমীক্ষা ও কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় শুধু নতুন নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন করে সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় কত গভীরতায় পানি পাওয়া যাচ্ছে, কোন এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে, কোথায় আর্সেনিকের ঝুঁকি রয়েছে এবং কোন এলাকায় কী পরিমাণ পানি উত্তোলন হচ্ছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যক্তি ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে গভীর নলকূপ স্থাপনে কার্যকর নজরদারি, বড় প্রতিষ্ঠানের পানি উত্তোলনের পরিমাণ নির্ধারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও জলাশয় রক্ষা এবং বৃষ্টির পানি ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দারা অচল সরকারি নলকূপগুলো দ্রুত মেরামত করে সচল করার দাবি জানিয়েছেন। যেসব এলাকায় হস্তচালিত নলকূপে পানি উঠছে না, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবিও রয়েছে। একই সঙ্গে আর্সেনিকযুক্ত নলকূপ চিহ্নিত করে সেখানে নিরাপদ পানির বিকল্প ব্যবস্থা, সরকারি-বেসরকারি সব গভীর নলকূপের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ওপর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। বিশেষ করে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহৃত গভীর নলকূপের অনুমোদন, সংখ্যা ও পানি উত্তোলনের পরিমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ও উত্তোলন নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বাবুগঞ্জে নিরাপদ খাবার পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ভবিষ্যৎ পানিসংকটের সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন