প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পাহাড়ের ঢালে একটি অদ্ভুত আকৃতির দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মাটির নিচে একটি বিশাল নৌযান রয়েছে। বহু বছর ধরে এই দৃশ্যটি গবেষকদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কিছু গবেষক মনে করেন, এটি একটি প্রাকৃতিক শিলাগঠন। অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞের দাবি, এখানে বাইবেলে বর্ণিত নূহের নৌকার চিহ্ন লুকিয়ে থাকতে পারে।
জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশনে নতুন রাডার জরিপ সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ‘নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস’ নামের একটি গবেষণা সংগঠন দাবি করেছে, তাদের নতুন ভূগর্ভস্থ রাডার স্ক্যানে ওই স্থানের নিচে কিছু কাঠামোর সন্ধান মিলেছে, যা প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠনের পরিবর্তে মানবসৃষ্ট কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তবে এই দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি এবং গবেষণাটি পিয়ার-রিভিউডও নয়।
মাটির নিচে কী দেখা গেল?
নতুন জরিপে ব্যবহার করা হয়েছে প্রকৌশলী ড. খসরো বাখতারের তৈরি ‘বাখতাররাডার’ নামের একটি ভূগর্ভস্থ ইমেজিং প্রযুক্তি। নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস (এনএএস) -এর দাবি, স্ক্যানে কয়েকটি সরলরেখা, কোণাকুণি সংযোগ, স্তরবিন্যাস এবং সম্ভাব্য ফাঁকা জায়গার অস্তিত্ব ধরা পড়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব বৈশিষ্ট্যকে সম্ভাব্য করিডর, কক্ষ বা অভ্যন্তরীণ একাধিক স্তরের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাদের মতে, এগুলো কেবল স্বাভাবিক শিলার অস্বাভাবিকতা নয়; বরং একই কোনো কাঠামোর অংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ড. বাখতার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, তার কয়েক দশকের কর্মজীবনে এমন অস্বাভাবিকতা তিনি আগে দেখেননি। তবে এসব কাঠামো আসলে কী- নৌযান, অন্য কোনো বস্তু, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু- সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি তিনি।
নূহের নৌকার সঙ্গে যোগসূত্র কেন?
তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশন প্রথম নজরে আসে ১৯৫৯ সালে। কুর্দি এক রাখালের আবিষ্কারের পর তুরস্কের সেনা কর্মকর্তা ইলহান দুরুপিনারের নাম অনুসারে জায়গাটির নামকরণ করা হয় দুরুপিনার। এর অস্বাভাবিক নৌকার মতো আকৃতি এবং আরারাত পর্বতের কাছাকাছি অবস্থান দ্রুতই এটিকে নূহের নৌকার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।
বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের সময় নূহের কিশতি আরারাত পর্বতমালার এলাকায় থেমেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই সূত্র ধরেই কয়েক দশক ধরে দুরুপিনারকে সম্ভাব্য নৌকার স্থান হিসেবে দেখার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু এত বছরেও প্রত্নতাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিকভাবে এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা জায়গাটিকে নূহের কিশতির ধ্বংসাবশেষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। বরং ১৯৯০-এর দশকে প্রকাশিত এক গবেষণায় আমেরিকান উদ্ধার বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফাসোল্ড ও ভূতত্ত্ববিদ লরেন্স কলিন্স যুক্তি দেন, দুরুপিনারের গঠনটি আসলে প্রাকৃতিক শিলাগঠন। কথিত লোহার অংশ নিয়েও তাদের গবেষণায় প্রাকৃতিক আগ্নেয় খনিজের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল।
এবার খননেও জোর
২০২৬ সালে তুরস্ক সরকার দুরুপিনার এলাকায় আরও বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের অনুমতি দেয়। এর পরই নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস (এনএএস) নতুন করে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করে। রাডার জরিপের পাশাপাশি গবেষকরা গঠনটির ভেতরে ড্রিলিং শুরু করেছেন। উদ্দেশ্য-মাটির বিভিন্ন স্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা এবং সেখানে কাঠ বা অন্য কোনো জৈব পদার্থের অস্তিত্ব আছে কি-না, তা পরীক্ষা করা।
এমনকি সরু ছিদ্র দিয়ে একটি ছোট ‘গোফার’ রোবটও পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস (এনএএস)। সংগঠনটির দাবি, রোবটটি নিচে গিয়ে এমন কোনো শক্ত শিলা বা বেডরকে আটকে যায়নি, যা পুরো কাঠামোটিকে সাধারণ ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।
এ ছাড়া ফরমেশনের উন্মুক্ত পাশ ও কিনারা থেকেও মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনায় জীবাশ্মকৃত কাঠ কিংবা মানুষের তৈরি কোনো উপাদানের চিহ্ন রয়েছে কি-না, তা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
প্রমাণ মিলবে, নাকি রহস্যই থেকে যাবে?
দুরুপিনারকে ঘিরে নূহের কিশতির রহস্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে নানা দাবি, অনুসন্ধান ও তত্ত্ব এই জায়গাটিকে আলোচনায় রেখেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দাবিই বৈজ্ঞানিকভাবে চূড়ান্ত প্রমাণে পরিণত হয়নি।
নতুন রাডার স্ক্যানের ফলাফল তাই কৌতূহল বাড়ালেও একে নূহের নৌকার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই। রাডারে দেখা অস্বাভাবিক কাঠামো আসলে কী, তা জানতে মাটির নমুনার পরীক্ষার ফল, আরও বিস্তৃত খনন এবং স্বাধীন গবেষকদের যাচাই প্রয়োজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন