প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রতারণা সন্দেহজনক ফোনকল বা ইমেইলের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় অপরাধীরা কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রতারণার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্ট থেকে তারা একজন ব্যক্তির পরিবার, কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে এই তথ্য ব্যবহার করে তারা বিশ্বাসযোগ্য পরিচয়ে প্রতারণা করে।
এনডিটিভি জানায়, জন্মদিনের পোস্ট, সন্তানের স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনের ছবি কিংবা নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার খবর—এসব তথ্য সাধারণ মনে হলেও প্রতারকদের কাজে লাগতে পারে। বিভিন্ন পোস্ট থেকে সংগৃহীত তথ্য একত্রিত করে তারা এমন গল্প তৈরি করতে পারে, যা দেখে সহজেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। পরিচিত বা বিশ্বস্ত কারও পরিচয় ব্যবহার করে তারা টাকা চাইতে পারে অথবা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান মিটিগাটার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সার্তক দুবে এনডিটিভিকে বলেন, "অনলাইনে শেয়ার করা তথ্য প্রতারকদের লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে জানতে এবং আরো বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতারণা করতে সাহায্য করে।" কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে মানুষের কণ্ঠস্বর ও পরিচয় নকল করা সহজ হওয়ায় এই ঝুঁকি আরো বেড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইলে থাকা জন্মদিন, স্কুলের নাম, পরিবারের সদস্যদের নাম কিংবা পোষা প্রাণীর নামও প্রতারকদের কাজে লাগতে পারে। এসব তথ্য ব্যবহার করে তারা পরিচয় চুরি করতে পারে। এমনকি বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা প্রশ্নের উত্তর বের করা বা পাসওয়ার্ড অনুমান করার চেষ্টা করতে পারে।
যদি কোনো প্রতারক কারও সন্তানের নাম, স্কুল ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারে, তাহলে সে পরিবারের সদস্য পরিচয়ে বার্তা পাঠাতে পারে। ওই বার্তায় জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে টাকা চাওয়া কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতে পারে।
বার্তায় ব্যক্তিগত জীবনের পরিচিত তথ্য থাকায় সেটিকে সত্যি বলে মনে হতে পারে। ফলে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে না পেরে অনেকে টাকা পাঠিয়ে দেন বা ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে বসেন।
প্রতারকেরা শুধু ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, পেশাগত যোগাযোগের মাধ্যম থেকেও তথ্য সংগ্রহ করে। লিংকডইনে প্রকাশিত চাকরির পদবি, কর্মীদের দায়িত্ব, নতুন নিয়োগের খবর ও কাজসংক্রান্ত পোস্ট দেখে তারা একটি প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।
এসব তথ্য থেকে বোঝা সম্ভব হতে পারে, প্রতিষ্ঠানে কে টাকা লেনদেন করেন, কে অর্থ পাঠানোর অনুমোদন দেন এবং কে নতুন কাজে যোগ দিয়েছেন। নতুন কর্মীরা এ ধরনের প্রতারণার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। কারণ, তারা তখনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও কাজের পদ্ধতি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন না। এই সুযোগে প্রতারকেরা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয়ে তাদের দ্রুত টাকা পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারে।
একইভাবে অর্থ ও হিসাব বিভাগের কর্মীদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তাদের ভুল বুঝিয়ে প্রতারকের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর চেষ্টা করতে পারে অপরাধীরা। কর্মীদের অফিসের ইমেইল ঠিকানাও ব্যবহার করা হতে পারে প্রতারণামূলক বার্তা পাঠানোর জন্য।
অনলাইনে পাওয়া ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে চুরি হওয়া পাসওয়ার্ড ও এআই প্রযুক্তি যুক্ত হলে প্রতারণার ঝুঁকি আরো বাড়ে।
বিভিন্ন সময়ে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় প্রকাশ হয়ে যাওয়া পাসওয়ার্ড অনলাইনে থেকে যেতে পারে। অনেকে একাধিক অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। ফলে একটি অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড চুরি হলে অন্য অ্যাকাউন্টেও প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে অপরাধীরা।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও কণ্ঠস্বর নকল করাও সম্ভব। প্রকাশ্য ভিডিও, সাক্ষাৎকার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট থেকে পাওয়া কণ্ঠস্বরের নমুনা ব্যবহার করে এ ধরনের নকল তৈরি করা হতে পারে।
এরপর পরিবারের সদস্যের কণ্ঠস্বর নকল করে জরুরি প্রয়োজনে টাকা চাওয়া কিংবা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিচয়ে কর্মীকে টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
এআইভিত্তিক বিভিন্ন সরঞ্জাম সহজলভ্য হওয়ায় অন্যের কণ্ঠস্বর ও পরিচয় নকল করতে আগের তুলনায় কম সময়, অর্থ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা লাগতে পারে। তাই পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনলেই কাউকে আসল ব্যক্তি বলে বিশ্বাস করা নিরাপদ নয়。
প্রতারণা থেকে বাঁচতে পাঁচটি সতর্কতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টাকা বা তথ্য চাওয়ার অনুরোধ যাচাই করা জরুরি। প্রতারণার ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
১. ব্যক্তিগত তথ্য সীমিত রাখুন : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জন্মদিন, পরিবারের ছবি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য কারা দেখতে পারবেন, তা নির্ধারণ করুন। সংবেদনশীল তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত রাখবেন না।
২. টাকা চাওয়ার অনুরোধ যাচাই করুন : পরিবারের সদস্য পরিচয়ে কেউ জরুরি ভিত্তিতে টাকা চাইলে তার পরিচিত ফোন নম্বরে কল করে নিশ্চিত হোন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একটি গোপন সংকেত বা শব্দও ঠিক করে রাখা যেতে পারে।
৩. অফিসের আর্থিক নির্দেশ যাচাই করুন : নতুন করে টাকা পাঠানোর নির্দেশ বা ব্যাংক হিসাব পরিবর্তনের অনুরোধ এলে অন্য একটি যোগাযোগমাধ্যমে তা নিশ্চিত করুন। সন্দেহজনক বার্তায় দেওয়া নম্বরের বদলে আগে থেকে জানা বিশ্বস্ত নম্বরে যোগাযোগ করুন।
৪. অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা বাড়ান : প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। পাশাপাশি দুই বা তার বেশি ধাপে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু রাখুন। সম্ভব হলে পরিচয় যাচাইয়ের নিরাপত্তা অ্যাপ বা নিরাপত্তা চাবি ব্যবহার করুন।
৫. পোস্ট দেওয়ার আগে সতর্ক হোন : ব্যক্তিগত তথ্য, ভ্রমণের পরিকল্পনা কিংবা নিরাপত্তা প্রশ্নের উত্তর অনুমান করতে সাহায্য করে—এমন তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন। কর্মক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব ও কাজের ধরন সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশের বিষয়েও সতর্ক থাকুন।
প্রতারকেরা সাধারণত ভুক্তভোগীকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। ফোন করে পরিবারের কোনো সদস্য বিপদে পড়েছেন বলে জানানো হতে পারে। আবার প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিচয়ে ইমেইল পাঠিয়ে দ্রুত টাকা পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হতে পারে।
এ ধরনের অনুরোধের উদ্দেশ্য হলো, ভুক্তভোগী যেন চিন্তা করার বা তথ্য যাচাই করার সময় না পান। তাই জরুরি বলে চাপ দেওয়া হলে আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
প্রতারণা করতে অপরাধীদের সব সময় কারও অ্যাকাউন্টে প্রবেশের প্রয়োজন হয় না। মানুষ অনলাইনে স্বেচ্ছায় যেসব তথ্য প্রকাশ করে, সেগুলো দিয়েই তারা বিশ্বাসযোগ্য পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ তৈরি করতে পারে।
জন্মদিনের তথ্য বা একটি ছবি একা বড় ঝুঁকি তৈরি না করলেও পরিবারের তথ্য, কর্মক্ষেত্রের পরিচিতি, ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ড ও নকল কণ্ঠস্বরের সঙ্গে যুক্ত হলে তা প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাই অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকা এবং টাকা পাঠানো বা সংবেদনশীল তথ্য দেওয়ার আগে পরিচয় যাচাই করাই প্রতারণা ঠেকানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন