প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কিশোরগঞ্জ, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : পান বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন খাবার, যা আমাদের সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে রাজশাহী, বরিশাল (টরকি), চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে শতাব্দী ধরে পানের চাষ হয়ে আসছে। কিশোরগঞ্জের মাটি পান চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় এখানে প্রচুর পরিমাণে পান উৎপাদন হচ্ছে, ফলে পাকুন্দিয়া পৌরসদরের পাটমহালের পানবাজার সারা বছরই জমজমাট থাকে।
ফজরের আজানের আগেই কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া পৌরসদরের পাটমহালের পানবাজার সরগরম হয়ে ওঠে। কৃষকরা ভ্যান, অটোরিকশা ও পিকআপে করে পানভর্তি ঝুড়ি নিয়ে আসেন। কারও মাথায় পানের বিড়া, কারও হাতে বস্তা থাকে। ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় পান বাছাই, ভিরা গোনা ও দরদাম।
পাইকাররা ভিরা হাতে নিয়ে পানের আকার, রং ও মান যাচাই করেন। দরদাম মিলে গেলেই মুহূর্তের মধ্যে পান হাতবদল হয়। বড়জোর দুই ঘণ্টার এই বেচাকেনায় প্রতিটি হাটে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়। শীত মৌসুমে চাহিদা ও দাম বাড়লে কিছু কিছু হাটে লেনদেন কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
প্রতি শনি ও বুধবার বসা পাটমহালের পানবাজার এখন শুধুমাত্র কেনাবেচার স্থান নয়, এটি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও। এই হাটকে ঘিরে কৃষক, পাইকার, আড়তদার, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার চরফরাদী, এগারসিন্দুর, হোসেন্দী, নারান্দী ও সুখিয়া ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বরাটিয়া, হিজলীয়া, লক্ষীয়া ও সৈয়দগাঁও এলাকায় পান চাষ হয়। উপজেলায় প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ করছেন প্রায় ৮৬০ জন কৃষক, যার মধ্যে ২৪৫ জন নারী।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, উপজেলায় বছরে উৎপাদিত পানের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। সারাবছরই এসব এলাকায় লাল ডিঙ্গি ও গয়েসুর জাতের পান উৎপাদিত হয়। স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়া পান চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় এখানকার পানের মান ভালো বলেও কৃষি কর্মকর্তারা জানান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-ই-আলম বাসস’কে জানান, পান একটি লাভজনক কৃষিপণ্য। সারা বছর কৃষকেরা পান বিক্রি করে আয় করেন। প্রতি বিঘায় বছরে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মণ পান উৎপাদন হতে পারে। উৎপাদন খরচের তুলনায় কৃষকরা ভালো লাভ করে থাকেন।
তিনি আরও বলেন, উপজেলায় পান সংরক্ষণের জন্য কোনো সংরক্ষণাগার নেই। তবে রোগবালাই দমনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। পানচাষিদের চাহিদা অনুযায়ী বিসিআইসির টিএসপি ও ডিএপি সার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দ রাখা হয়।
সপ্তাহে দুই দিন জমে বড় বাজার পাটমহালের পানহাটে প্রতি হাটে প্রায় ৪শ’ কৃষক পান নিয়ে আসেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক পাইকারও এ বাজারে আসেন বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
হাটের ইজারাদার কফিল উদ্দিন বলেন, প্রতি হাটে সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়। পানের মৌসুমে চাহিদা ও দাম বাড়লে কিছু কিছু হাটে লেনদেন কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে কৃষক ও পাইকাররা আসায় হাটের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।
পাটমহালের হাটে আসা পান শুধুমাত্র পাকুন্দিয়াতেই বিক্রি হয় না। হাট শেষ হওয়ার আগেই এসব পান কটিয়াদী, ভৈরব, নিকলী, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে চলে যায়।
গাজীপুর থেকে পান কিনতে আসা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে এ হাট থেকে পান কিনছেন। এখানকার পানের মান ভালো হওয়ায় গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পাইকারি বিক্রির জন্য পান নিয়ে যান।
পান ব্যবসায়ী স্বাধীন জানান, তিনি পাকুন্দিয়া থেকে কয়েক লাখ টাকার পান কিনে কটিয়াদী, ভৈরব, নরসিংদী ও নিকলীসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠান। স্থানীয় ব্যবসায়ী মনির উদ্দিন বলেন, তিনিও প্রতি হাটে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার পান কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, হাটে কৃষকের কাছ থেকে ২০ বিড়া পান প্রায় ৪ হাজার টাকায় কেনা হয়। পরিবহন, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে পাইকারি পর্যায়ে এর দাম দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। পরবর্তী আড়ত বা বাজারে দাম হয় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টাকা। খুচরা পর্যায়ে একই পরিমাণ পান বিক্রি হয় প্রায় ৬ হাজার টাকায়।
ফলে বরজ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি কুড়ি পানে দামের পার্থক্য প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। পানের মান, চাহিদা, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি ও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকির কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে দাম পরিবর্তিত হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
বর্তমানে ভালো মানের লাল ডিঙ্গি পান প্রতি কুড়ি প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং গয়েসুর জাতের পান আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কৃষকরা জানান, বাজারদর ভালো থাকলে পানচাষ থেকে আয় বাড়ে। তবে সরবরাহ বেড়ে গেলে বা দাম কমে গেলে উৎপাদন খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে।
পাকুন্দিয়ার দরদরা, বরাটিয়া, হিজলীয়া, লক্ষীয়া, নামালক্ষীয়া, সৈয়দগাঁও, হোসেন্দী চরপাড়া, মির্জাপুর ও বাহাদিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পান চাষ হয়ে আসছে। অনেক পরিবারে পানচাষ এখন বংশপরম্পরার পেশায় পরিণত হয়েছে।
তবে কৃষকরা জানান, বাঁশ, শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। রোগবালাই এবং পানের দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সবসময় সে অনুযায়ী পান বিক্রির দাম পাওয়া যায় না।
পান নিয়ে হাটে আসা কৃষকদের বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত জায়গা ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাব।
কৃষক হাদিকুল ইসলাম বলেন, পান উৎপাদন করে ভালো আয় হলেও বাজারে পান নিয়ে এসে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। বসার ও পান রাখার জায়গা পর্যাপ্ত নেই। বৃষ্টি হলে পান রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, স্থায়ী শেড, ভালো রাস্তা, পানি ও নিরাপদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে ভোগান্তি কমবে। বিক্রি না হওয়া পান রাখার ব্যবস্থা থাকলে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে। বাজারে ছাউনি, পান রাখার জায়গা, আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রূপম দাস বাসস’কে বলেন, পাকুন্দিয়া পৌরসভা বাজার ও শ্রীরামদী কোল্ড স্টোর বাজার একসঙ্গে ইজারা দেওয়া হয়। পাটমহল বা পানমহলের জন্য আলাদা কোনো ইজারা ব্যবস্থা নেই। ফলে এ পানবাজার থেকে আলাদাভাবে কত রাজস্ব আদায় হয়, তার হিসাব নেই।
তিনি বলেন, পাটমহলের রাস্তার উন্নয়নে আইইউজিআইপি (ওটএওচ) প্রকল্পের আওতায় টেন্ডার হয়েছে। ইতোমধ্যে এমপি রাস্তার কাজের উদ্বোধন করেছেন। ঠিকাদার শিগগিরই কাজ শুরু করবেন।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সঠিক পরিচর্যা, উন্নত বাজারব্যবস্থা, সংরক্ষণ সুবিধা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে পাকুন্দিয়ার পানচাষ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, পানের অপচয় কমানো এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন