প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হাটে পণ্য কেনাবেচা হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বারোআড়িয়া হাটে মৌসুমি সময়ে ‘মানুষও বিক্রি’ হয়ে থাকে। তবে এই বিক্রির প্রক্রিয়া স্থায়ী নয়; কৃষিকাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শ্রম বিক্রি করেন মানুষ। আমন মৌসুমে এই দৃশ্য বারোআড়িয়া হাটের বিশেষ পরিচয় হয়ে উঠেছে।
ভাদ্র মাস চলছে, দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বর্তমানে আমন ধান রোপণ ও ক্ষেত পরিচর্যার কাজ চলছে। আষাঢ় থেকে ভাদ্র, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমন রোপণ ও পরিচর্যার সময়কাল। এই সময় কৃষকদের জমিতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজন মেটাতে সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, দাকোপ, আসাশুনি, তালাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলা থেকে শ্রমিকরা বারোআড়িয়া হাটে আসেন।
সকাল হলেই হাটের নির্দিষ্ট স্থানে শ্রমিকরা জড়ো হন। কেউ একা, আবার কেউ দল বেঁধে আসেন। গৃহস্থরা তাদের সঙ্গে কথা বলেন, কাজের অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করেন। শারীরিক সক্ষমতা এবং কাজের দক্ষতাও বিবেচনা করা হয়। এরপর দরদাম শুরু হয়। কারও সঙ্গে এক সপ্তাহের, কারও ১৫ দিনের চুক্তি হয়। চুক্তি চূড়ান্ত হলে শ্রমিক গৃহস্থের সঙ্গে চলে যান।
বর্তমান আমন মৌসুমে বারোআড়িয়া হাটে সাপ্তাহিক চুক্তিতে একজন শ্রমিকের দাম প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা উঠছে। শ্রমিকের অভিজ্ঞতা, কাজের ধরন, শারীরিক সক্ষমতা এবং চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পারিশ্রমিকের পরিমাণ কমবেশি হয়।
রায়পুর এলাকার গৃহস্থ ওয়ালিদ গাজী মন্তব্য করেন, “আমাদের জমি রোপণের জন্য আটজন শ্রমিক নিয়েছি। জমি রোপণের সময় এবং ধান কাটার সময়ও বারোআড়িয়া বাজার থেকে শ্রমিক নিতে হয়। কৃষিকাজের ব্যস্ত সময়ে এখান থেকেই প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যায়।”
শ্যামনগর উপজেলার ঘুমঘাট এলাকার শ্রমিক লক্ষ্মণ কুমার বৈরাগী বলেন, "আমরা প্রতিবছর দুইবার এই হাটে কাজের জন্য আসি। কখনো এক সপ্তাহের চুক্তিতে, আবার কখনো ১৫ দিনের চুক্তিতে কাজ করি। গত সপ্তাহে দেলুটি ইউনিয়নের গেউয়াবুনিয়া গ্রামে কাজ করেছি।"
সাতক্ষীরার তালা উপজেলা থেকে আসা শ্রমিক রুদ্র রায় জানান, "এ বছর মোটামুটি ভালো দাম পাচ্ছি। সাপ্তাহিক চুক্তিতে ৫ হাজার ৬০০ টাকায় কাজ নিয়েছি।"
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি সময়ে তারা এই হাটে আসেন। নিজেদের এলাকায় কাজের সুযোগ কমে গেলে অথবা আমন ও বোরো মৌসুমে শ্রমের চাহিদা বাড়লে তারা দলবেঁধে বিভিন্ন এলাকায় যান। কাজের বিনিময়ে পাওয়া পারিশ্রমিক তাদের পরিবারের আয়-রোজগারের অন্যতম অবলম্বন।
অন্যদিকে কৃষকদের জন্য এই হাট হয়ে উঠেছে প্রয়োজনের সময়ে শ্রমিক পাওয়ার নির্ভরযোগ্য স্থান। ধান রোপণ কিংবা কাটার মতো মৌসুমি কৃষিকাজে অল্প সময়ে বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। স্থানীয়ভাবে সেই চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন ধরে বারোআড়িয়া হাট ভূমিকা রেখে আসছে।
তবে ‘মানুষ বিক্রি’ শব্দবন্ধের আড়ালে দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। এখানে মানুষ নিজের শ্রম, সময় ও সামর্থ্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিতে দেন। তাদের শ্রমের বিনিময়ে কৃষকের জমি সচল থাকে, ধান রোপণ হয় এবং ঘরে ফসল ওঠে।
সুরখালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস কে জাকির হোসেন লিটু বলেন, বারোআড়িয়া হাট তাই শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মৌসুমি শ্রমবাজার।
বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থান্দার কামরুজ্জামান মন্তব্য করেন, কৃষিকাজের মৌসুমে শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যে এ ধরনের চুক্তিভিত্তিক শ্রমবাজার স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে একদিকে কৃষকরা প্রয়োজনের সময়ে শ্রমিক পাচ্ছেন, অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষও নিজেদের শ্রমের বিনিময়ে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষক ও শ্রমিক উভয়ের স্বার্থ যাতে সুরক্ষিত থাকে এবং কোনো পক্ষ যেন প্রতারণা বা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রশাসন সচেতন রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন