প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরানের একটি সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় চলতি বছরে নির্মাণ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তেহরান সম্ভবত এই স্থাপনাটি পাহাড়ের গভীরে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, যাতে সম্ভাব্য পারমাণবিক কর্মসূচি সুরক্ষিত রাখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরে ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ স্থাপনায় নির্মাণ তৎপরতার একটি স্পষ্ট উল্লম্ফন ঘটেছে। বিশ্লেষকরা ছয় বছরের স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করে এই তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে একচেটিয়াভাবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের কাছে দেওয়া হয়। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন, যা তেহরানের প্রায় ১৪০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত নাতাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের নিকটবর্তী, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ইরানের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক কর্মসূচি সুরক্ষিত রাখার সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষকদের মতে, ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনাটি সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।
সেন্ট্রিফিউজ সরানোর আশঙ্কা
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইরান ভবিষ্যতে এই স্থাপনায় সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে নিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিকবার পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা খুব শিগগিরই পিকঅ্যাক্সে হামলা করতে পারি।” তিনি আরও দাবি করেন, স্থাপনাটিতে কারা চলাচল করছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তথ্য রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, গ্রানাইট পাথরের বিশাল পাহাড়ের নিচে নির্মিত এই স্থাপনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন লক্ষ্যবস্তু। এমনকি পেন্টাগনের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমাগুলোও পাহাড়ের এত গভীরে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
সিএসআইএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনই একমাত্র পারমাণবিক স্থাপনা নয়, যা বর্তমান প্রজন্মের প্রচলিত অস্ত্রের নাগালের বাইরে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
গভীর ভূগর্ভে হামলার নতুন উপায় খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এসব গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলার নতুন সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী এখন পর্যন্ত মূলত অন্যান্য ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালেও ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের বিশেষ পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতরের ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি বা ডিটিআরএ নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে একটি বিশেষ ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাকেন্দ্র মেরামতের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১২ লাখ ডলারের একটি চুক্তি করে।
চুক্তির নথিতে বলা হয়, দ্রুত উদ্ভূত হুমকির বিরুদ্ধে গোপন সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য সেখানে একটি ‘লাইভ-ফায়ার টেস্ট’ পরিচালনা করা হবে। নথিটি ফেডারেল ডেটাবেজে ২৭ ফেব্রুয়ারি আপলোড করা হয়—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর এক দিন আগে।
চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি সময়-সংবেদনশীল নির্দেশনার কারণে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, পরীক্ষার পরিকল্পনার সঙ্গে ইরান যুদ্ধের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সবচেয়ে গভীরে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে হামলার কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করা এবং সম্ভবত নির্দিষ্ট পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পরিস্থিতি অনুকরণ করা।
আগের হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি কিছু স্থাপনা। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক বাহিনী ওই অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’।
সেই হামলায় তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও অত্যন্ত গভীরে অবস্থিত কিছু কেন্দ্র পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা আইনপ্রণেতাদের জানান, ইসফাহানের গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাটির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্রবেশপথ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। কারণ পেন্টাগনের ধারণা ছিল, তাদের বর্তমান বাঙ্কার-বিধ্বংসী বোমা ওই স্থাপনাটির মূল ভূগর্ভস্থ অংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম নয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত বাঙ্কার-বিধ্বংসী অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর বা এমওপি। তবে আরও গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে সক্ষম নতুন প্রজন্মের একটি পেনিট্রেটর বোমা তৈরির কাজ চলছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন অস্ত্রটির একটি প্রোটোটাইপ তৈরির প্রাথমিক চুক্তি দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনেও নতুন এই অস্ত্র তৈরিতে প্রতিরক্ষা শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করে মার্কিন বিমান বাহিনী।
হোয়াইট স্যান্ডসে রহস্যজনক পরীক্ষা
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, গত ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস এলাকায় একটি দূরবর্তী পরীক্ষাস্থলে খননকাজ শুরু হয়। স্থানটি ডিটিআরএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড পরিচালনা করে। সেখানে গভীর ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুর ওপর অস্ত্রের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়।
চুক্তির সময়সূচির সঙ্গে স্যাটেলাইটে দেখা নির্মাণকাজের সময়ের মিল পাওয়া গেছে। ফেডারেল চুক্তির নথি অনুযায়ী, পেট কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান ১৭ ফেব্রুয়ারি কাজের প্রাথমিক ব্যয়ের হিসাব দেয় এবং পরদিন চুক্তিটি পায়। মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত ওই এলাকায় খননকাজ চলতে দেখা যায়। স্যাটেলাইট চিত্রে খননকৃত মাটির স্তূপ ধীরে ধীরে বড় হতে দেখা গেলেও পরে তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মতো হোয়াইট স্যান্ডসের পরীক্ষাস্থলটিও গ্রানাইট শিলার মধ্যে নির্মিত। তবে সেখানে পরিকল্পিত অস্ত্র পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত হয়েছে কি না, কিংবা স্যাটেলাইটে দেখা কার্যক্রমের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি সিএনএন। এ বিষয়ে পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্যও করেনি।
হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর আগে থেকেই কার্যকর পরিকল্পনা রয়েছে। গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও তীব্র করার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন বিবেচনাধীন লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনও ছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় প্রচলিত বোমাগুলোর কয়েকটি ব্যবহার করার কথা ছিল। তবে এসব বোমা পাহাড়ের যথেষ্ট গভীরে প্রবেশ করে ভেতরে থাকা সম্ভাব্য পারমাণবিক সরঞ্জাম বা অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
এদিকে গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় কার্যকর ও সিদ্ধান্তমূলক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের বিভিন্ন বিভাগ সম্প্রতি দ্রুতগতির বিশেষ পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে।
পিকঅ্যাক্সে কী তৈরি করছে ইরান?
সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনাটি সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি উদ্দেশ্যের যেকোনও একটির জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন কেন্দ্র, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র অথবা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনও কার্যক্রমের নিরাপদ স্থাপনা।
এর মধ্যে ইউরেনিয়াম ধাতুতে রূপান্তরসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল পারমাণবিক কার্যক্রমও থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে নির্মাণকাজের ধরন বদলেছে। প্রথম দিকে ব্যাপক খননকাজ চললেও বর্তমানে কার্যক্রম সম্ভবত স্থাপনাটির অভ্যন্তরীণ নির্মাণ এবং বাইরের অংশ আরও শক্তিশালী করার দিকে চলে গেছে।
চলতি বছর পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় সড়কে যানবাহন চলাচল বেড়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে। এছাড়া সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ উঁচু ও শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ সড়ক পাকা করা, প্রবেশপথের আশপাশে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি এবং সুড়ঙ্গ খননের সময় বের হওয়া মাটি সমতল করে সরিয়ে নেওয়ার কাজও হয়েছে।
এখনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের উপযোগী নয়? তবে সিএসআইএসের বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, স্থাপনাটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান নির্মাণকাজ থেকে ধারণা করা যায়, এটি এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে যদি এর উদ্দেশ্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হয়, তাহলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এখনও সেই ধরনের কার্যক্রম শুরু করার সক্ষমতা অর্জন করেনি বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে ইরান যদি ভবিষ্যতে তার পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাহাড়ের গভীরে সরিয়ে নেয়, তাহলে সেটি ধ্বংস করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য বড় সামরিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। গ্রানাইট পাহাড়ের গভীরে নির্মিত এমন স্থাপনা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত বোমারও সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে চলমান যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের সক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত প্রশ্ন হয়ে উঠছে। সূত্র:
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন