প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নদীর বুকে সারিবদ্ধ নৌকাগুলি। নৌকাগুলিতে সাজানো রয়েছে তাজা শসা, লাউ, করলা, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, ঝিঙে, বড়বটি—এমন সব ধরনের সবজি।
কৃষকদের চিৎকার এবং পাইকারদের দরদামে সকাল থেকেই চারপাশ মুখর হয়ে আছে।
বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের গজালিয়া খালে শতবর্ষী ভাসমান সবজি হাটের দৃশ্য এটি।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই ভাসমান সবজির হাট সপ্তাহে দুই দিন—রবি ও বুধবার বসে। কৃষকদের উৎপাদিত সবজি বিক্রির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
শুধু বাগেরহাট নয়, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা নৌকা ও ট্রলার নিয়ে এখানে আসেন সবজি কিনতে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গজালিয়া বাজারের পাশে গজালিয়া খালে ভাসমান হাটে বেচাকেনা চলে চার ঘণ্টা ধরে। এই সময়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার সবজি বেচাকেনা হয়। পুরো মৌসুমে এই হাটে কেনাবেচার পরিমাণ প্রায় চার কোটি টাকার
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গজালিয়া খালে হাটের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। আশপাশের গ্রামের কৃষকরা নিজেদের জমিতে উৎপাদিত সবজি নৌকায় করে নিয়ে আসছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৌকার সংখ্যা বাড়তে থাকে।
নৌকায় করে সবজি নিয়ে আসা কৃষকরা জানান, এই হাটে সরাসরি পাইকারদের কাছে সবজি বিক্রি করতে পারায় তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যায়। একই সঙ্গে দ্রুত বিক্রি হয়ে যাওয়ায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকে।
পিরোজপুরের ব্যবসায়ী সালাম হালাদার বলেন, গজালিয়ার এই হাটে একসঙ্গে অনেক ধরনের টাটকা সবজি পাওয়া যায়। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সবজি কেনার সুযোগ থাকায় আমরা এখান থেকে বড় পরিসরে বিভিন্ন সবজি সংগ্রহ করতে পারি। পরে এসব সবজি পিরোজপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে বিক্রি করি।
বরিশালের ব্যবসায়ী সুলতান শেখ বলেন, গজালিয়া খালের ভাসমান হাটে নিয়মিত অনেক কৃষক সবজি নিয়ে আসেন। তাই অন্য জায়গার তুলনায় এখানে একসঙ্গে বেশি সবজি কেনা যায়। ভোর থেকে শুরু করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বড় ধরনের বেচাকেনা হয়ে যায়। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হলে ব্যবসার পরিধি আরো বাড়বে।
স্থানীয়দের দাবি, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে গজালিয়া খালে এই ভাসমান হাট চলে আসছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় কৃষকরা এখানে নিজেদের উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে আসছেন। তাদের কাছ থেকে কেনা এসব সবজি নৌকা ও ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলে আধুনিক বাজারব্যবস্থার সঙ্গে এর সংযোগ বাড়ানো গেলে শতবর্ষী এই হাটটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় সবজি বিপণনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য স্থানীয়দের। এতে স্থানীয় কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে বলে মনে করেন তারা।
স্থানীয় কৃষক রাজ্জাক মোল্লা জানান, তারা নিজের জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেন। হাটের দিনে নৌকায় করে সবজি নিয়ে আসেন। এখানে পাইকাররা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সবজি কিনে নেন। ফলে তাদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় এবং পরিবহন খরচও তুলনামূলক কম পড়ে।
তবে সম্ভাবনাময় এই হাটে রয়েছে নানা সমস্যা। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক এবং নৌকা-ট্রলার ভেড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামোর অভাবে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুনের ভাষ্য, হাটটি অনেক পুরনো। এখানে প্রচুর সবজি চাষি ওঠে এবং অনেক ব্যবসায়ী আসেন। কিন্তু হাটে আসার সড়ক ভালো না। নৌকা ও ট্রলার ভেড়ানোর জন্যও ভালো ব্যবস্থা নেই। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরো বাড়ে।
তিনি বলেন, হাটের নির্দিষ্ট জায়গায় নৌকা ও ট্রলার নোঙরের ব্যবস্থা, সড়ক সংস্কার, পণ্য ওঠানামার সুবিধা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা গেলে বেচাকেনা কয়েক গুণ বাড়তে পারে।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, গজালিয়ার ভাসমান সবজি হাটটি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের উৎপাদিত সবজি দ্রুত পাইকারদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। এতে কৃষক যেমন বাজার পাচ্ছেন, তেমনি ভোক্তার কাছে দ্রুত তাজা সবজি পৌঁছাচ্ছে।
উপপরিচালক জানান, চার ঘণ্টার এ হাটে বেচাকেনা হয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার সবজি। আর পুরো মৌসুমে এই হাটে কেনাবেচা হয় প্রায় চার কোটি টাকার।
হাটের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে উপপরিচালক বলেন, হাটটির অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে, এগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবজি চাষে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাজারজাত করার প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন