প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আপেলের বীজে কি মৃত্যু লুকিয়ে আছে? বিজ্ঞান কী বলছে
সাম্প্রতিক সময়ে ‘মায়াপাখি’ নামের একটি নাটকের একটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। নাটকের মধ্যে দেখা যায়, আপেলের বীজ খাওয়ার পর নায়িকার মৃত্যু ঘটছে। এরপর থেকেই অনেকের মনে প্রশ্ন এসেছে—আসলেই কি আপেলের বীজ এতটাই বিষাক্ত? যদি কেউ ভুলবশত কয়েকটি বীজ খেয়ে ফেলেন, তাহলে কি তার জীবন সংকটের মুখে পড়তে পারে?
সামাজিক মাধ্যমে এ বিষয়ক নানা আলোচনা এবং বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়লেও বিজ্ঞান এই বিষয়ে কী বলছে, সেটি জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, সহজ ভাষায় আপেলের বীজের প্রকৃত তথ্য জানি।
আপেলের বীজে আসলে কী উপাদান রয়েছে?
আপেলের বীজে একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক যৌগ থাকে, যার নাম অ্যামিগডালিন (Amygdalin)। এটি এমন একটি যৌগ যা শুধু আপেলে নয়, চেরি, এপ্রিকট, পিচসহ আরো অনেক ফলের বীজেও পFound হয়।
অ্যামিগডালিন নিজে সরাসরি বিষাক্ত নয়। তবে এটি শরীরে হজমের সময় ভেঙে গিয়ে হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করে, যা অত্যন্ত বিষাক্ত একটি রাসায়নিক যৌগ হিসেবে পরিচিত।
তাহলে কি আপেলের বীজ খাওয়া বিপজ্জনক?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। আপেলের বীজ থেকে ক্ষতির ঝুঁকি মূলত তার পরিমাণ এবং কীভাবে বীজটি খাওয়া হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত বেশ কিছু বীজ ভুলবশত গিলে ফেললে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ বীজের বাইরের খোসা যথেষ্ট শক্ত, তাই সহজে হজম হয় না। ফলস্বরূপ, বীজের অন্তর্গত উপাদান বের হওয়ার আগেই এটি শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
তবে যদি বীজগুলো চিবিয়ে অথবা গুঁড়ো করে খাওয়া হয়, তখন অ্যামিগডালিন মুক্ত হয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং সেখান থেকে সায়ানাইড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু সাধারণত অল্প পরিমাণে এমন হলেও তা ক্ষতিকর অবস্থায় পৌঁছায় না।
কতটা খেলে বিপদ হতে পারে?
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরির জন্য অনেক বেশি পরিমাণ বীজ খেতে হবে। গবেষকদের মতে, বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে প্রায় ১৫০ থেকে কয়েক হাজার চিবানো বীজ খেতে হতে পারে। অন্য রকমভাবে, প্রায় ২০ থেকে ৪০টি আপেলের বীজ একসঙ্গে গুঁড়ো করে খেলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
এদিকে, একটি আপেলে সাধারণত ৫ থেকে ৮টি বীজ থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবে আপেল খেতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
সায়ানাইড শরীরের জন্য কীভাবে ক্ষতিকর?
যদি শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণ সায়ানাইড প্রবেশ করে, তবে এটি কোষের অক্সিজেন ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে শরীর এক ধরনের ‘অভ্যন্তরীণ শ্বাসরোধ’ অবস্থায় চলে যায়। এর ফলে দেখা দিতে পারে—
> মাথা ঘোরা
> বমি বমি ভাব অথবা বমি
> শ্বাসকষ্ট
> দুর্বলতা
> গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু
কিন্তু এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য যে পরিমাণ সায়ানাইড প্রয়োজন, তা সাধারণত আপেলের কয়েকটি বীজ খাওয়ার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।
তাহলে কি আপেল খাওয়া নিরাপদ?
অবশ্যই নিরাপদ। আপেল বিশ্বব্যাপী অন্যতম স্বাস্থ্যকর ফল বলে বিবেচিত। এতে প্রচুর ফাইবার, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিভিন্ন উপকারী পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা হৃদ্স্বাস্থ্য, হজমশক্তি ও সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আপেল খাওয়ার কারণে কোনো ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই।
সতর্কতা
যদিও সাধারণভাবে আপেলের বীজ ক্ষতির কারণ হয় না, তথাপি কিছু সতর্কতা মেনে চলা উচিত—
✔ ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি পরিমাণ বীজ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
✔ শিশুদের আপেল খাওয়ানোর সময় বীজ আলাদা করে দেওয়া ভালো।
✔ বীজ চিবিয়ে বা গুঁড়ো করে খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করা উচিত।
এতে অসঙ্গতিপূর্ণ খবর পাওয়া যায় যে, আপেলের বীজে বিষাক্ত যৌগ রয়েছে। কিন্তু এই তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ বাস্তবে কয়েকটি আপেলের বীজ খেয়ে বিষক্রিয়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি রাখতে পারে না এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত কম।
সুতরাং আপেল খাওয়ার সময় ভুল করে একটি-দুটি বীজ চলে গেলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই। বরং পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা স্বাস্থ্যসম্মত। নাটক অথবা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক সত্যকে গুরুত্ব দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তথ্যসূত্র: হেলথলাইন, মেডিক্যাল নিউজ টুডে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন