প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ : ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বুধবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এর আগে সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে, জ্বালানি খাতের এ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনাকেন্দ্রের কাছে একটি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট, যা হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, জানিয়েছে যে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করা হয়েছে। এ সময় শহরের মধ্যে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক হামলার শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবারের হামলাটি ছিল কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী। হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধের তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
হুতিদের হামলার জবাবে সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানায় তাদের শক্ত ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। সানা বহু বছর ধরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রিয়াদ থেকে এএফপি জানাচ্ছে, হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তাদের বাহিনী ‘ধাহরানে আরামকোকে লক্ষ্য করে একটি অত্যন্ত-নির্ভুল সামরিক হানলা’ চালিয়েছে। তিনি জানান, রিয়াদ বিমানবন্দর ও রাজধানীর একটি তেল শোধনাগার লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এসব হামলা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ‘আগামী দিনগুলোতেও অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ সময় সৌদি শত্রুপক্ষের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে।’
এর আগে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ধাহরানে আরামকোর একটি ভবনে হামলা হয়েছে। এতে ‘সীমিত অগ্নিকাণ্ড’ ঘটলেও কেউ আহত বা নিহত হননি।
ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর অবস্থিত, যেখানে অসংখ্য ভবন ও আবাসিক কমপ্লেক্স রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে দেওয়া বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মী জানান, রাতের বেলায় সদর দপ্তরের একটি টাওয়ারে আঘাত হানা হয়।
তাদের একজন বলেন, ‘ওপরের তিনটি তলা আর নেই।’ এ বিষয়ে অবগত আরেকটি সূত্রও হামলা এবং ভবনটিতে আঘাত হানার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এএফপিকে ঘটনাস্থলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি, ফলে ভবনটির ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সৌদি আরবে অধিকাংশ হামলা রাজধানীর উপকণ্ঠের অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হলেও সাম্প্রতিক হামলাগুলো ক্রমেই শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি চলে আসছে বলে মনে হচ্ছে।
এএফপির এক সাংবাদিক জানান, শহরের কেন্দ্রস্থলে বাসিন্দাদের গাড়ি থামিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেছে। মঙ্গলবার রাতে আকাশে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের সাদা ধোঁয়ার রেখা দেখা যায়। এর পরপরই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
শহরের একটি প্রধান সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেন, একটি বিপণিবিতানের ওপর দিয়ে ‘আকাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ বস্তু ছুটে যেতে দেখেছি’।
তার ভাষ্য, বস্তুটি যাওয়ার সময় ‘হলদেটে আলোর রেখা, এরপর ধোঁয়ার রেখা’ দেখা যায়। পরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ শান্ত ছিল; কেউ কথা বলছিল না। আমরা ভীত ছিলাম এবং সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।’
রিয়াদে এএফপির সাংবাদিকেরা জানান, বুধবারও একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ সময় মুঠোফোনে পাঠানো সতর্কবার্তায় ‘আকাশপথে হুমকি’র কথা জানিয়ে মানুষকে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরে হুতিদের মুখপাত্র সারি বলেন, গোষ্ঠীটি আবারও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রিয়াদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মঙ্গলবার ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন তেল স্থাপনায় হামলা চালায়। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি বলেন, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল এমন স্থাপনা, যেগুলো ‘রাজ্য, ইয়েমেন, দক্ষিণ লোহিত সাগর ও নৌপথের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে’ ব্যবহৃত হচ্ছিল।
২০১৫ সাল থেকে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের সরকারকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এ যুদ্ধ দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে।
হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের রাজধানী সানায় জ্বালানির ঘাটতির আশঙ্কায় বহু বেসামরিক মানুষকে পেট্রল পাম্পের সামনে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে বলে এএফপির এক সাংবাদিক জানান।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সূত্রপাত শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার মধ্য দিয়ে। ওই হামলায় ১৩ জন নিহত হন। ২০১৫ সালের পর সৌদি আরবে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, ‘দেশটির নিরাপত্তা কিংবা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে দেওয়া হবে না।’
এএফপির সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের যানজটপূর্ণ সড়কগুলোতে এ সপ্তাহে যানবাহনের চলাচল লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। সব স্কুলে দূরশিক্ষণ চালু এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে বাড়ি থেকে কাজের নির্দেশ দেওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের ফুটবল লিগ (এসপিএল) ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আল নাসর-সংশ্লিষ্ট ম্যাচসহ তিনটি খেলা স্থগিত করার কথা জানিয়েছে।
আয়োজকেরা আগামী সপ্তাহে শুরু হওয়ার কথা থাকা ‘সিক্স কিংস স্ল্যাম’ টেনিস টুর্নামেন্টও পিছিয়ে ডিসেম্বর মাসে আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে হুতি হামলা সত্ত্বেও চলতি মাসের শেষ দিকে রিয়াদে বড় একটি বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে সৌদি আরব। ‘মরুভূমির দাভোস’ নামে পরিচিত এ সম্মেলনে সশরীরে ও ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণের সুযোগ এবং বিকল্প আকাশপথ ও স্থলপথে যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো এএফপিকে জানিয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানের কারণে সৌদি আরবের বাণিজ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে জুলাইয়ে ইয়েমেনের স্থগিত যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ায় সংঘাত সৌদি আরবের নিজ ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়েছে। লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা দেশটির বিকল্প রপ্তানি পথকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন