প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত নর্দমার পানি, বেপরোয়া মাছ ধরা এবং একের পর এক বিশাল বাঁধ নির্মাণের চাপে পড়ে প্রায় নিঃশেষ হতে বসেছিল এশিয়ার দীর্ঘতম নদী ইয়াংজি। প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীকে চীনের ‘মা নদী’ বলা হয়। বহু বছরের লাগামহীন দূষণ এবং অব্যবস্থাপনার কারণে নদীটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের চূড়ান্ত কিনারায় পৌঁছেছিল। দূষণের প্রভাবে নদীর অনন্য প্রাণী, সাদারঙা বাইজি ডলফিন এবং বিশালাকার চাইনিজ প্যাডলফিশ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
তবে সম্প্রতি চীন সরকারের নেওয়া কঠোর কিছু প্রশাসনিক নীতি এবং সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থার ফলে নদীটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। দ্য ইকোনমিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংসের হাত থেকে ইয়াংজিকে টেনে তোলার প্রধান চালিকাশক্তি হলো ২০২১ সাল থেকে নেওয়া একগুচ্ছ বিপ্লবী সিদ্ধান্ত। এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ১০ বছরের জন্য বাণিজ্যিক মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণা। ৫০-এর দশকে প্রতিবছর ইয়াংজি থেকে ৪ লাখ টনের বেশি মাছ ধরা হতো, কিন্তু ২০২১ সালে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে সেই পরিমাণ কমে এক লাখ টনের নিচে নেমে আসে।
চীন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ সাত দশক ধরে কমতে থাকা ইয়াংজির মাছের মোট পরিমাণ বা ‘বায়োমাস’ ২০২১ সালের পর থেকে ২০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এমনকি দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিরল প্রজাতির স্টার্জন মাছকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ডিম ছাড়তে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা।
নিষেধাজ্ঞা তদারকি করার জন্য নদীতে সার্বক্ষণিক ড্রোন, নজরদারী ক্যামেরা এবং টহল বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি কঠোর জরিমানা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া নদীটির তীরবর্তী হাজার হাজার রাসায়নিক কারখানা বন্ধ করা হয়েছে অথবা দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নদীর উজানে মাটির ক্ষয় রোধের জন্য ব্যাপকভাবে গাছ লাগানো হচ্ছে। নদীর অববাহিকার শহরগুলোতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে কৃত্রিম জলাভূমি তৈরি করা হচ্ছে এবং সেগুলোকে ‘স্পঞ্জ সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
এই সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নদীর বাস্তুতন্ত্রেও নতুন করে প্রাণ ফিরছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইয়াংজি অববাহিকায় বর্তমানে ১,৪০০টির বেশি ফিনলেস পরপয়েস বাস করছে, যেখানে ২০১৭ সালে এর সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ১ হাজারে। স্থানীয়রা গোলগাল এই প্রাণীকে ‘নদীর শূকর’ নামে চেনে। ফিনলেস পরপয়েসের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াটা পুরো নদীর খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্র সুস্থ হওয়ার প্রধান লক্ষণ বলে মনে করছেন সংরক্ষণবিদেরা।
তবে পরিবেশ সুরক্ষার এই সাফল্যের অপর পাশে বড় ধরনের সামাজিক মূল্য দিতে হয়েছে। হঠাৎ মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার জেলে জীবিকা হারিয়েছেন। অনেক এলাকাতেই তারা পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাননি বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক জেলেরা। বাধ্য হয়ে তাদের একটি বড় অংশ শহরে গিয়ে দিনমজুরের কাজ বেছে নিয়েছেন।
যদিও পরিবেশবিদেরা বলছেন, সাফল্য সত্ত্বেও ইয়াংজির সামনে এখনো বড় বাধা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাঁধ। থ্রি গর্জেস ড্যামসহ ইয়াংজি নদীতে বহু বড় বাঁধ রয়েছে, যা মাছের স্বাভাবিক প্রজনন এবং চলাচলে বাধা তৈরি করে। সম্প্রতি পয়াং হ্রদের মুখে নতুন একটি বাঁধ নির্মাণের অনুমোদনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, পুরোনো বাঁধগুলোতে মাছ চলাচলের পথ না রাখলে ইয়াংজি নদী পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন