প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দীর্ঘ কয়েক দশক পর আলবেনিয়া নজিরবিহীন সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়েছে। রাজধানী তিরানা সহ প্রধান শহরগুলোতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ঘটে।
সরকারি ভবন এবং কিছু বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কীভাবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এবং কেন পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ক্রমবর্ধমান আকার ধারণ করছে। রাজধানী তিরানায় কয়েক মাস ধরে চলা এই আন্দোলন গত মঙ্গলবার সহিংস হয়ে ওঠে। এরপর তা দুরেস, শকোডার, লেঝা, ভ্লোরা, জিরোকাস্টার ও কোরচে সহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার ব্যয় এবং জীবনযাত্রার খরচ কমানোর দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলেও, এটি এখন সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা শিক্ষার ফি ও বইয়ের দাম কমানোর পাশাপাশি বাড়তি ব্যয় মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা চাইছেন। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশগ্রহণ করেছে।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে মুখোশধারী আন্দোলনকারীরা পুলিশের দিকে পাথর ছোড়ে। পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস এবং লাঠিচার্জ ব্যবহার করে। এ সময় একটি যুবককে ভাঙা পা নিয়ে যন্ত্রণায় কাতর অবস্থায় সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়া হলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। এক পর্যায়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি তলায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া আরও কয়েকটি সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটেছিল আরও আগে। টানা প্রায় ১৩৫ দিন ধরে রাজধানী তিরানার কেন্দ্রে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সরকারবিরোধীরা জড়ো হতো। তাদের হাতে গোলাপি ফ্ল্যামিঙ্গোর ছবি থাকত। তাদের প্রধান দাবি ছিল, প্রধানমন্ত্রী এডি রামাকে পদত্যাগ করতে হবে। রামা বর্তমানে তার চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলের একটি বড় পর্যটন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা আশঙ্কা করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় শহর ভ্লোরার কাছের একটি দ্বীপে ফ্ল্যামিঙ্গো পাখির আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়বে।
পর্যটন প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সরকারের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও গভীর হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে একজন উপপ্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন এবং আরেকজনকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর তদন্ত চলছে।
এখন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয় কমানোর দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দুর্নীতিবিরোধী ক্ষোভ ও প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ছড়িয়ে পড়া এবং সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরছে।
আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী ফ্ল্যামিঙ্গো আন্দোলন ক্রমেই সহিংস রূপ নিচ্ছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তাদের অন্যতম স্লোগান, ‘রামা জেলে, বেরিশা জেলে’। এর মাধ্যমে তারা প্রধানমন্ত্রী এডি রামা এবং বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি সালি বেরিশার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
শুরুতে এই আন্দোলনে তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি বয়স্ক মানুষ, অভিভাবক এবং তাঁদের দাদা-দাদিরাও অংশ নিতেন। বিক্ষোভ শেষে অনেকেই নিজের উদ্যোগে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতেন। তবে কয়েক মাস ধরে আন্দোলন চলা এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা কমতে থাকে। একই সময়ে আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি।
বর্তমান বিক্ষোভ আগের তুলনায় অনেক বেশি সহিংস হয়ে উঠেছে। সংঘর্ষে কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার পথে থাকা আলবেনিয়ার এই পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিবিসিকে কয়েকজন তরুণ বিক্ষোভকারী বলেছেন, বর্তমান আন্দোলন আগের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের নতুন একটি পর্যায়। লিভিয়া নামের এক তরুণী অভিযোগ করেন, পাঁচ মাস ধরে চলা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে অপমান ও উপহাসের মাধ্যমে উপেক্ষা করা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে আমাদের কথা শোনা হবে না।’
ব্রুনেলা নামের আরেক তরুণী বিবিসির ‘হোয়াট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ অনুষ্ঠানে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যম ও সরকার যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তা তাকে আতঙ্কিত করছে। তার মতে, এই আন্দোলন শুধু একজনের নয়, বরং আলবেনিয়ার তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত প্রতিবাদ।
আগের ফ্ল্যামিঙ্গো আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ফ্ল্যামিঙ্গো আন্দোলনের নেতারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কিছু বলেননি। ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকেও কেউ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি।
আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ দুর্নীতি। প্রধানমন্ত্রী এডি রামার বক্তব্য, দুর্নীতির অভিযোগগুলো বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত।
আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন করছেন প্রধানমন্ত্রী এডি রামা। তিনি একই সঙ্গে অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য বিরোধীদলীয় নেতা সালি বেরিশাকে দায়ী করেছেন।
শুক্রবার রামা অভিযোগ করেন, বিরোধী দল দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তার দাবি, সহিংসতার মাধ্যমে আলবেনিয়ার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে তিনি পদত্যাগের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে জনগণের কথা শোনা, তাদের ন্যায্য উদ্বেগের সমাধান করা এবং দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বেরিশার নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেটিক পার্টি অতীতেও রামা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। দলটির সমর্থকেরা কয়েক মাস ধরে আন্দোলন করেছেন এবং বিভিন্ন সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়েছেন। তবে এবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেশি। ফলে চলমান অস্থিরতার পেছনে বেরিশার ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে আলবেনিয়ার কয়েকটি গণমাধ্যমে চলমান বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এ ঘটনায় সার্বিয়ার বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে।
কয়েকজন বিশ্লেষকের ধারণা, ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পথে আলবেনিয়ার অগ্রগতি নিয়ে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের অসন্তোষ থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণের তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রী রামাও শুক্রবার বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, কিছু বিদেশি শক্তি আলবেনিয়ায় শান্তি ও ঐক্য চায় না। একই সঙ্গে তারা দেশটিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার পথে বাধা দিতে চায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রামা আরো প্রশ্ন তোলেন, আলবেনিয়া যখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পথে নতুন অগ্রগতি অর্জন করে, তখনই কেন সহিংসতা শুরু হয়। তাঁর দাবি, বর্তমান অস্থিরতার পেছনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা থাকতে পারে। তবে বিরোধী দলের ভূমিকা কিংবা বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার কোনো তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
আলবেনিয়া ভ্রমণ কি নিরাপদ?
আলবেনিয়ার বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লেও পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দেশটিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন এমন পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার পর্যটকদের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসরণ করতে বলেছে। পাশাপাশি বিক্ষোভ, বড় ধরনের জনসমাবেশ ও রাজনৈতিক মিছিল এড়িয়ে চলার এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আলবেনিয়া ইউরোপের একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। দেশটির সরকার বলছে, চলমান সহিংসতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলবেনিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পর্যটন খাতের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার প্রচেষ্টার ওপরও। তাই আলবেনিয়া ভ্রমণের আগে পর্যটকদের সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং বিক্ষোভপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন