প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশাল মহানগর পুলিশ (বিএমপি)-এর ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ (সোমবার)। এই উপলক্ষে আজ সকাল ১১টায় বিএমপি সদর দপ্তরে কর্তৃপক্ষ একটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। তবে, বরিশালের ‘মহানগর পুলিশ’ প্রতিষ্ঠার দুই দশক পরেও জনবল ও যানবাহনসহ বিভিন্ন সংকটে ভুগছে। জনবল সংকট এই মহানগর পুলিশের জন্য প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলে বেশিরভাগ সময় উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে সাধারণ মানুষের। গত ৩ মাসে বরিশাল মহানগর পুলিশ থেকে ৩ জন উপ-কমিশনারকে বদলি করা হয়েছে, কিন্তু নতুন করে একজনকেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
বরিশাল মহানগর পুলিশের অনুমোদিত জনবল ২,১৩৫ জন, তবে কর্মরত সংখ্যা প্রায় ১,৮৫০ জন। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ছে। নগরীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও মহানগর পুলিশ নানা সমস্যার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, যার মধ্যে জনবল ও যানবাহন সংকট অন্যতম। নগরীর ট্রাফিক পুলিশের সীমাবদ্ধতার কারণে অবৈধ রিকশা ও ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রাস্তার দখল নিচ্ছে, ফলে যানজট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে অনেক সময়।
এ মহানগর পুলিশ ইউনিটে অতিরিক্ত কমিশনারের দুটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ৮ জন উপ-কমিশনারের মধ্যে ৩ জন কাজ করছেন। ১১ জন অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের মধ্যে ৪ জন রয়েছেন। সহকারী কমিশনারের ১৭টি পদের অর্ধেকেরও বেশি শূন্য।
গত দুই দশকে বিএমপি সদর দপ্তর, পুলিশ লাইন্স ও এয়ারপোর্ট থানার ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি বন্দর থানার নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। কোতোয়ালি থানার নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ চলতি অর্থবছরে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কাউনিয়া থানার নির্মাণ প্রকল্প এখনও অনুমোদন পায়নি। প্রায় শত বছরের পুরোনো পুলিশ কমিশনারের বাসভবন নির্মাণ এখনও সম্পন্ন হয়নি। বরিশাল জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের জরাজীর্ণ বাসভবনে ডিআইজি পদমর্যাদার বিএমপি কমিশনার বসবাস করছেন।
সব মিলিয়ে, গত দুই দশকেও বরিশাল মহানগর পুলিশ পূর্ণতা না পাওয়ায় নগরীর সাধারণ মানুষ এবং সমাজ সচেতনদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তবে সদ্য যোগ দেওয়া বিএমপি কমিশনার সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। দেশের যেকোনো মহানগরীর তুলনায় বরিশাল মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা যথেষ্ট ভালো বলেও তিনি দাবি করেছেন। সাধারণ মানুষ নগরীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ে খুব সন্তুষ্ট না হলেও অসন্তুষ্টও নন।
অপরাধ পর্যবেক্ষকদের মতে, নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে বড় কোনো সমস্যা নেই। তবে মহানগর পুলিশ এসব বিষয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। প্রতি রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্লক রেইড পরিচালনা করছে পুলিশ। নগরীর মাদকের নিরাপদ আখড়া কেডিসি বস্তিসহ অন্যান্য এলাকায় অভিযান চালিয়ে আস্তানা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সন্দেহভাজন প্রতিটি এলাকায় মাদক নির্মূলে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত ১ আগস্ট থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বিএমপি সহস্রাধিক সন্দেহভাজনসহ বিভিন্ন মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে মাদক মামলার অভিযুক্তও রয়েছে।
গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহে যোগ দেওয়া বিএমপির ২২তম কমিশনার আবু রায়হান মো. সালেহ জানান, সংকট ও সমস্যা থাকবেই। তবে তার মাঝেও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে তারা নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি জানান, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই।
২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর বিকেলে বরিশাল মহানগরীর ওয়াপদা কলোনি মাঠে বিএমপির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন সিটি মেয়র ও সদর আসনের এমপি মুজিবুর রহমান সারোয়ার। অনুষ্ঠানে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তবে সময়ের ব্যবধানে উদ্বোধনী ফলকটি উধাও হয়ে গেছে। ফলে দেশের ৫ম মহানগর পুলিশের শুরুর কোনো স্মৃতিচিহ্নও আর অবশিষ্ট নেই। সেদিন বরিশাল রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি আমিনুল ইসলাম প্রথম ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব লাভ করেছিলেন। শুরুতে সাবেক কোতোয়ালি থানা নিয়ে মহানগর পুলিশ ইউনিটের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে থানার সংখ্যা ৪টি। তবে কোনো থানাতেই চাহিদা মাফিক যানবাহন নেই। ফলে বিশেষ করে রাতের বেলা নগরীতে টহল দিতে প্রতিনিয়ত সংকটে পড়তে হচ্ছে এ পুলিশ ইউনিটকে। নগরীর রূপাতলী-কালিজিরা ও জাগুয়া এলাকা নিয়ে একটি থানার পাশাপাশি এয়ারপোর্ট থানাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে নবগ্রাম রোড-চৌমহনী থেকে কড়াপুর পর্যন্ত একটি থানার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। চরমোনাই ইউনিয়ন ও সংলগ্ন এলাকা নিয়ে আরও একটি থানার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন ওয়াকিফহাল মহল।
২০০৬ থেকে হাঁটি হাঁটি পায়ে এ মহানগর পুলিশের কার্যক্রম চললেও ব্যাপক জনবল ঘাটতি এ পুলিশ ইউনিটের পথচলায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনবল ঘাটতি এ পুলিশ ইউনিটটির স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে। তবে গত দুই দশকে নগরীর ওয়াপদা কলোনির মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় এক একর জমি পুলিশ অধিদপ্তর কিনে সেখানে বিএমপির সদর দপ্তর ভবন নির্মিত হয়েছে। নগরীর রূপাতলী এলাকায় প্রায় ২৫ একর জমির ওপর পুলিশ লাইন্স কার্যক্রম শুরু হলেও তা মহানগরীর একদম শেষ প্রান্তে হওয়ায় যেকোনো বড় ধরনের সংকটকালে ‘ফোর্স মুভমেন্ট’ অনেকটাই সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ছে। প্রাথমিক অবস্থায় নগরীর কেন্দ্রস্থলে জেলা পুলিশ লাইন্সটি মহানগর পুলিশের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে পরে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে বিএমপি প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের জনবল মঞ্জুরি প্রায় সাড়ে ১২শো থেকে পরবর্তীতে ২,০৭৩-এ উন্নীত হওয়ার পর বর্তমানে তা ২,১৩৫ জনে উন্নীত হয়েছে। ২০১৮ সালে এ মহানগরীতে আরও ৪টি পুলিশ স্টেশন ও কয়েকটি ফাঁড়িসহ জনবল প্রায় ৪ হাজার ৩শো জনে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিগত ৮ বছরেও তার অনুমোদন মেলেনি।
অপরদিকে বিদ্যমান জনবল কাঠামোর মধ্যেই অতিরিক্ত কমিশনার, উপ-কমিশনার থেকে পরিদর্শক, এসআই, টিএসআই, সার্জেন্ট এবং কনস্টেবলের বিপুল সংখ্যক পদসমূহে জনবল ঘাটতি বরিশাল মহানগর পুলিশ ইউনিটের কর্মকাণ্ডকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
যদিও গত দুই দশকে এ মহানগরীর আইনশৃঙ্খলাসহ এ পুলিশ ইউনিটের বেশকিছু উন্নয়ন এবং নগরবাসীর মাঝে অনেক সচেতনতার পাশাপাশি শৃঙ্খলও ফিরে এসেছে। জুলাই বিপ্লবের পরে টানা প্রায় ১৫ দিন পুলিশি কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির থাকলেও এ নগরীতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কোনো সংকট তৈরি হয়নি। পুলিশের সাথে সাধারণ মানুষের একটি গ্রহণযোগ্য সম্পর্কও বিদ্যমান রয়েছে।
তবে অবৈধ যানবাহনের চাপে পুরো নগরী এখন নুইয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে নগর প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশের মাঝে এখনও প্রয়োজনীয় সমন্বয় গড়ে ওঠেনি। অবৈধ যানবাহনের নৈরাজ্যে অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশও অসহায় হয়ে পড়ছে। এ নগরীতে হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধে ন্যূনতম কোনো পদক্ষেপ নেই। নগরীজুড়ে দানবের মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাহিন্দ্রা-আলফার মতো বড় মাপের বেপরোয়া থ্রি-হুইলারও। এ নগরীর সব অবৈধ যানবাহনের মতো তাদের চালকরাও অবৈধ। একভাগ চালকেরও কোনো লাইসেন্স নেই। তাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে এ নগরীর পথে পথে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা এ নগরীর নিয়তি হয়ে উঠেছে।
বরিশাল মহানগর পুলিশের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মো. সালেহর সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, দেশের যেকোনো এলাকার তুলনায় এ নগরীর আইনশৃঙ্খলা ভালো। আমরা চেষ্টা করছি জনবান্ধব একটি পুলিশ ইউনিট গড়ে তুলতে। এ নগরীতে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে এবং নির্ভয়ে দিনরাত চলাচল করতে পারছেন বলে জানিয়ে তিনি বলেন, রোজা, ঈদ, পূজা, বড়দিনসহ কোরবানির পশুর হাটগুলো নির্বিঘ্নে ও স্বাভাবিকভাবেই চলছে। যেকোনো উৎসবের আগে নগরবাসীর মতামত নিয়ে এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ত করেই আমরা এ নগরীর আইনশৃঙ্খলা আরও উন্নয়নের চেষ্টা করছি বলেও জানান বিএমপি কমিশনার। তার মতে অতি সম্প্রতি দুর্গাপূজা অত্যন্ত নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন