প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৬:১৪ এম || প্রকাশের তারিখঃ ১৫ই আগস্ট, ২০২৬ইং; ০৮:০২ এম
পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলায় প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে জমি দখল, মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও নানা নির্যাতনের অভিযোগ এনে ক্ষতিপূরণ এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন প্রতিবন্ধী দিনমজুর মো. শহিদুল ইসলাম ও তার পরিবার।
এ নিয়ে গত ৬ ও ৭ আগস্ট বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসলে ৯ আগস্ট নির্যাতিত ওই প্রতিবন্ধী শহিদুল ইসলামের বাড়িতে পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের হোগলাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা। সে পেশায় একজন দিনমজুর ছিলেন এবং এক সময় স্বাভাবিকভাবে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে দিনপার করতেন প্রতিবন্ধী শহিদুল। এর মাঝেই তার জীবনে নেমে আসলো কালো ছায়া, প্রতিবেশী মোস্তফা হাওলাদার ২০১০ সালে প্রয়াত জামায়াতে ইসলামী নেতা ও পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন। এরপর ২০১১ সালে তিনি ওই জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য আদালতে মামলা করেন।
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব খাটিয়ে মোস্তফা হাওলাদার তাদের জমি দখল করেন।
তাদের দাবি, ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া ৪০ শতাংশ এবং ১৯৩০ সালসহ বিভিন্ন সময়ে তাদের পূর্বপুরুষদের ক্রয় করা জমিসহ মোট ১৬৭ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন তারা। পরবর্তীতে কিছু জমি বিক্রি ও এওজ-বদল করার পর বসতভিটাসহ ১২১ শতাংশ জমি তাদের দখলে ছিল।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে দুর্বৃত্তদের হামলায় মোস্তফা হাওলাদার নিহত হন। এ ঘটনায় তার ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদার বাদী হয়ে জিয়ানগরের ইন্দুরকানী থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় শহিদুল ইসলামের অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছেলে সোলায়মান হাওলাদারকে তিন নম্বর আসামি করা হয়। একই মামলায় তার ভাই আব্দুর রহিম হাওলাদারকেও আসামি করা হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় এক বছর কারাগারে থাকার পর বিভিন্ন হয়রানির কারণে সোলায়মানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ২৮ বছর বয়সী সোলায়মান দিনমজুরি ও ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মোস্তফা হাওলাদারের মৃত্যুর পর তার ভাই রুস্তুম হাওলাদার ও কুদ্দুস হাওলাদার ওই জমির দখল নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে ভোগদখল করছেন। এ সময় জমির গাছ বিক্রি করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন এবং প্রতি বছর ধানি জমি লিজ দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেন তারা।
এছাড়াও তাদের দাবি, ছেলে দীর্ঘদিন মিথ্যা মামলায় কারাগারে থাকায় শহিদুল ইসলাম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরবর্তীতে তিনবার ব্রেইন স্ট্রোক করে তিনি প্রতিবন্ধী হয়ে যান। বর্তমানে অভিযুক্তরা বসতভিটা থেকেও উচ্ছেদের চেষ্টা, মারধর ও বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
প্রশাসন জানায়, প্রতিবন্ধী শহিদুলকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে তাদের দৃষ্টিগোচর হয়। পরে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাইদ এর নির্দেশনায় জিয়ানগর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মো: ওয়ালিউর রহমান রুবেল এর নেতৃত্বে একটি প্রশাসনিক দল গত ৯ আগস্ট সকালে শহিদুলের বাড়ি পরিদর্শনে যান। এবং দুই পক্ষকে ডেকে মিমাংসা করার চেষ্টা করে কুদ্দুস হাওলাদারকে নির্দেশনা দেন শহিদুলের জমি আদালতের রায় হওয়া পর্যন্ত বুঝিয়ে দিতে।
ভুক্তভোগী শহিদুলের ভাগিনা হাফিজুর রহমান নয়ন বলেন, আমার মামাদের জমি প্রতিবেশী ভূমি দস্যু কুদ্দুস, রুস্তম ও তাদের দুই ছেলে দীর্ঘ ১৫ বছর জোরপূর্বক দখলকরে খাচ্ছে। এ নিয়ে সাংবাদিকরা নিউজ করলে এসিল্যান্ড স্যারে পরিদর্শনে আসেন এবং মামলার রায় হওয়া পর্যন্ত আমাদেরকে ওই জমি দখলে নিতে বলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় ভূমি কমিশনার স্যারের নির্দেশনা অমান্য করে এখনো ওই জমি গুলো দখল করে রেখেছেন। পাশাপাশি অভিযুক্তরা প্রতিনিয়ত আমাদের পরিবারের সদস্যদের জীবননাশের হুমকি দিচ্ছেন। আমরা এই ভূমি দস্যুদের হাত থেকে বাচতে জেলা প্রশাসক স্যার এর কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করছি।
শহিদুলের স্ত্রী মঞ্জু বেগম কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, মোরা ঠিক মতো খাইতে পারি না। ঘরে চাউল নাই, বাজার নাই। মোর স্বামী ওদের অত্যাচারে অসুস্থ ওইয়া অচল, হের ঔষধ লাগে প্রত্যেকদিন কিন্তু ঔষধ নাই কিনমু কি দিয়া টাহা নাই। কুদ্দুসরা জমি না দহল হরলে মোগো জমি দিয়া কিছু খরচ চালাইতে পারতাম। কি হরমু এহন, মোগো না খাইয়া মরা লাগবে।
প্রতিবন্ধী শহিদুল কান্নাজড়িত কন্ঠে এবং অস্পষ্ট উচ্চারণে বলেন, আমাগো জমি ম্যালা বছর দহল কইরা রাখছে কুদ্দুসসহ ওর ভাই ও পোলারা। স্যারেরা আইয়া মিমাংসা কোইরা দিয়া গ্যাছে কিন্তু এহনো আমাগো জমি ছারেনাই। মুই ঔষধ কিনমু কি দিয়া, আর খামু কি আর এইভাবে বাচমু ক্যামনে।
অভিযুক্ত কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, এসিল্যান্ড স্যার পরিদর্শনে এসে আমাদের বলেছেন শহিদুলকে চলতে ফেরতে জায়গা দিয়েন। জমি ছেড়ে দিতে বলেনি, আমরা আদালতের রায় পর্যন্ত জমি দখলে রেখে খাবো। তবে নিজের নামে রেকর্ড না থাকলে জমি দখলে নিয়ে রাখতে পারবেন কিনা এই প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
জিয়ানগর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মো: ওয়ালিউর রহমান রুবেল বলেন, আমরা বিষয়টি অবগত হয়ে ডিসি স্যারের নির্দেশে সরেজমিনে তদন্তে যাই এবং দুপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিরোধপূর্ণ জমির তদন্ত করি। এছাড়া তাদের কাগজপত্র দেখে আমাদের যা মনে হয়েছে, সর্বশেষ যে বিএস রেকর্ড এবং তার পূর্বে যে এসএ রেকর্ড এই দুইটাতেই ওই প্রতিবন্ধী শহিদুল ইসলাম তার ওয়ারিশ যারা আছে তাদের নামে। কিন্তু সিএস রেকর্ড হয়েছে যারা বাদী মোস্তফা হাওলাদার, কুদ্দুস হাওলাদার তাদের নামে তবে তার মায়ের দাদী যেতন বিবি, সে আবার একটি মুক্তিনামা দলিল দিয়েছে যে সিএস রেকর্ড টা ভুলে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই জমি নিয়ে একটি দেওয়ানি মামলা চলমান ১৭৫/২০১১ এ কারণে আমরা যতটুকু বুঝতে পেরেছি যেহেতু ওই দেওয়ানি মামলার এখনো রায় হয়নি সুতারং জমির মালিক কে সেটা এখনো বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে এই টুকু আমরা বলতে পারি যে রিপোর্ট টা যার নামে আছে সেই এই জমি ভোগ করবে, রেকর্ড যেহেতু শহিদুল ইসলামের নামে আছে সেই ভোগ দখলে থাকার কথা। এখন এ অবস্থায় ওখান থেকে তাকে যদি কেউ উচ্ছেদ করতে চায় বা তার জমি যদি কেউ জোরপূর্বক দখলে নিতে চায়, সে ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে তিনি ১৪৫ ধরায় মামলা করতে পারেন।
তাছাড়া যেহেতু কুদ্দুস হাওলাদার ও তাদের কারো নামে রেকর্ড নেই সেজন্য তাদেরকে ওই বিরোধপূর্ণ জমিতে ঢুকতে নিষেধ করা হয়েছে এবং রিপোর্ট শহিদুলের নামে আছে সেই এটার ভোগদখলে থাকবে।
কুদ্দুস হাওলাদারকে বলা হয়েছে, আদালতের রায় যদি আপনার নামে আসে, তখন আপনারা ওই জমিতে যেতে পারবেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন