প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। বরিশালের উজিরপুরের নূর আলম স্ত্রী ও সন্তানসহ ছয়জনকে হারিয়ে এখন নির্বাক অবস্থায় রয়েছেন।
উজিরপুর (বরিশাল) থেকে মাহফুজুর রহমান মাসুম জানান, কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক এবং তিন শ্যালিকাকে হারিয়েছেন নূর আলম। অফিসের জরুরি কাজে একদিন আগে কক্সবাজার থেকে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসার ফলে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার জীবনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নূর আলম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়কোঠা ইউনিয়নের গাজীরপাড় গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত ছিলেন। চাকরির সুবাদে প্রায় আট বছর ধরে তিনি চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় স্ত্রী ও সন্তানসহ ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩) কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য তারা কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। গত ১৪ অক্টোবর, নূর আলম স্ত্রী ফারিয়া কবির এবং পাঁচ বছর বয়সি একমাত্র ছেলে ফাইজান নূরকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান। পরদিন বৃহস্পতিবার, শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন তারা।
কক্সবাজার পৌঁছানোর পর, অফিসের জরুরি কাজ থাকায় শুক্রবার নূর আলম একাই চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। তবে পরদিন শনিবার সকালে গণমাধ্যমে কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখে তিনি স্বজনদের খোঁজ নিতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে জানতে পারেন, ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ছয়জনই তার পরিবারের সদস্য।
নিহতদের মধ্যে রয়েছে নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), তাদের পাঁচ বছর বয়সি ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)। এ ঘটনায় আরো কয়েকজন হতাহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে নাফিসতা মীম (২৭) নামের একজনের পরিচয়ও জানা গেছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে মোট ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ছয়জন দগ্ধ হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দগ্ধদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন এবং তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান, ইসমাইল হোসেন মাসুদ ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেছা, মান্নান এবং সামিদা রয়েছেন। ইসমাইল হোসেন ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেছা নিহত ফারিয়া কবিরের মামা-মামি। তাদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছে এবং এর আগে সতর্ক করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নূর আলমের বাবা মোহাম্মদ আলী রাড়ি জানান, ছেলে বিয়ে করার পর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কখনই তাদের উজিরপুরের গ্রামের বাড়িতে আসেননি। নূর আলমের শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালীর তালতলীতে হলেও তার শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্যরা ঢাকার বনশ্রী এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। মোহাম্মদ আলী রাড়ি বলেন, পুত্রবধূ, নাতি এবং ছেলের শ্যালক-শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয়জনকে হারানোর খবর তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। লাশ আপাতত ঢাকায় দাফন করার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একসঙ্গে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়ে নূর আলম এখন নির্বাক। যে ভ্রমণটি ছিল পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানোর আয়োজন, সেটিই পরিণত হয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় শোকে।
অফিসের জরুরি কাজে এক দিন আগে কক্সবাজার থেকে ফিরে আসায় নূর আলম বেঁচে গেলেও হারিয়েছেন তার সবচেয়ে কাছের ছয়জনকে। স্বজনদের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো এখন তার কাছে শুধুই স্মৃতি।
নূর আলমের পরিবারের ছয় সদস্যের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে বরিশালের উজিরপুরের গাজীরপাড় গ্রামসহ এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
চুয়াডাঙ্গা থেকে মফিজুর রহমান জোয়ারদার জানান, ইনানী এলাকার একটি রিসোর্টে আগুন কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের হাসি-খুশি দুই সদস্যের প্রাণ। এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ার বাসিন্দা ফারিয়া কবীর (৩৩) এবং তার পাঁচ বছরের সন্তান ফাইজান। তাদের চিরবিদায়ে চুয়াডাঙ্গায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
ফারিয়ার পৈতৃক বাড়ি ছিল বরিশালে। গত ১৪ অক্টোবর পরিবারের সবাই মিলে অবকাশযাপনে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু কে জানত এই আনন্দ ভ্রমণই তাদের জীবনের শেষ ভ্রমণ হয়ে থাকবে।
শনিবার সকালে ইনানীর ওই রিসোর্টটিতে হঠাৎ করেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই আগুন চারদিকে ভয়াবহ রূপ নিলে ভেতরে আটকা পড়েন অনেকে। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান মা ফারিয়া ও ছোট্ট ফাইজান। একই পরিবারের মা ও অবুঝ শিশুর এমন করুণ পরিণতিতে স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং এলাকাবাসীর চোখ আজ অশ্রুসিক্ত। আনন্দময় একটি ছুটি কীভাবে একটি পরিবারের জন্য চিরন্তন কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াল, তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না কেউ।
মতলব উত্তর (চাঁদপুর) থেকে শেখ ওমর ফারুক জানান, ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পাটুয়ারটেক টুকটুক রিসোর্টে ওঠে মতলব উত্তরের ফতেপুর পূর্ব ইউনিয়নের দক্ষিণ ঠেটালীয়া গ্রামের রুহুল আমিন ঢালীর পরিবার। তারা একই পরিবারের ১০ জন ওই রিসোর্টে ওঠেন। ওই রিসোর্টে ২৮ জন অতিথি ছিলেন। তন্মধ্যে রুহুল আমিন ঢালির পরিবারের সদস্য ছিলেন ১০ জন। শনিবার টুকটুক রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে রুহুল আমিন ঢালির ছয় সদস্য আগুনে পুড়ে মারা যান।
মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালীয়া গ্রামের রুহুল আমিন (লিলু) ঢালীর আত্মীয়র পরিবারের ১০ জনের মধ্যে ছয়জন নিহত হন। জীবিত চারজনের মধ্যে আহত রুহুল আমিন (লিলু) ঢালীর ছেলে মাসুদ, রুহুল আমিন লিলুর ছেলের স্ত্রী মেহেরুন নেছা মিলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নুরে আলম ও আসিক সুস্থ আছেন। শনিবার সকাল ৭টায় টুকটুক রিসোর্টে আগুনে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানান মতলবের রুহুল আমিন (লিলু) ঢালী।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন