প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের অর্থনীতিতে নানা চাপের মধ্যে প্রবাস আয় স্বস্তি প্রদান করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭.৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে সৌদি আরবে সামরিক উত্তেজনা ও বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে এই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মন্তব্য করেছেন যে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, শিল্পের শ্লথগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কর্মসংস্থান, প্রবাসীদের আয় এবং দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের ১৬.১৩ শতাংশ সৌদি আরব থেকে এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে প্রায় ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার এসেছে। এই সময়ে মোট প্রবাস আয়ে সৌদি আরবের অংশ বেড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ হয়েছে। ফলে দেশটির শ্রমবাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কর্মী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছতে না পারলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতির কারণে রিয়াদ রুটের ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখতে হয়েছে। এ রুটে সপ্তাহে ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করে এয়ারলাইনসটি। ইতিমধ্যে প্রায় ১১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ঢাকা ও রিয়াদ মিলিয়ে আট থেকে নয় হাজার যাত্রী পরিবহনের অপেক্ষায় রয়েছেন। ফ্লাইট চালু হলেও সীমিত স্লটের কারণে আটকে পড়া যাত্রীদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া তিন লাখ ৩৩ হাজার ৪২৭ জন বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে এক লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৬ জন সৌদি আরবে গেছেন। অর্থাৎ এ সময়ে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর অর্ধেকের বেশি দেশটিকে বেছে নিয়েছেন। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ৩৮.৫৩ শতাংশ কমেছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে সংকটময় সময় পার করছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাস আয় ও শ্রমবাজারে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে সীমাবদ্ধতার কারণে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। সংঘাতের ফলে প্রবাসীদের আয় ও অর্থ পাঠানোর সুযোগ ব্যাহত হলে সরাসরি প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং প্রবাস আয়ের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে কর্মীদের আয় কমে যাওয়া, কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরা এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উল্লেখ করেছেন, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি ইউরোপ ও জাপানের মতো বিকল্প শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাড়াতে হবে।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে গেলে ডলারের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, রপ্তানি আয় ও অন্যান্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপর।
এক বছরে ১৭.৩০ শতাংশ রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে স্বস্তি দিলেও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা সেই অর্জন ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন