প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বৃ-চাপিলা শাহী জামে মসজিদ প্রাচীন ইতিহাসের একটি নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি স্থানীয়দের কাছে ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেই পরিচিত, এবং এখানে মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর ছাপ এখনো স্পষ্ট রয়েছে। মসজিদটির গঠনশৈলীতে তিনটি বড় গম্বুজ, পুরু দেয়াল, কারুকাজ করা প্রবেশদ্বার ও পুরোনো মেহরাবের কারুকাজ লক্ষ্যণীয়।
চাপিলা ইউনিয়নের বৃ-চাপিলা গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদ নাটোর জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। স্থানীয় ইতিহাস ও উপজেলা প্রশাসনের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে সম্রাট শাহজাহানের ছেলের শাসনকালে, শাহ সুজা বাংলার সুবাদার থাকাকালে চাপিলা অঞ্চলটি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখানে মুঘল সেনাদের একটি ফাঁড়িও ছিল বলে জানা যাচ্ছে। মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল সেনাসদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় মুসলমানদের নামাজে সুবিধার জন্য, যা স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে।
স্থানীয় ইতিহাস অনুসারে, মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন মুনশি এনায়েতউল্লাহ, যিনি মুঘল প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। গুরুদাসপুর উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।
চাপিলা এলাকায় তখন জনসংখ্যা কমে গেলে মুঘল সেনা এবং অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে যান, ফলে মসজিদটি ধীরে ধীরে ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে ঢেকে যায়। দীর্ঘদিন মানুষে অদৃষ্টি থাকে এই প্রাচীন স্থাপনাটির উপর।
স্থানীয়দের মতে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর নতুন মানুষ এসে সেখানে বসতি গড়তে শুরু করেন। সেই সময় জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা মসজিদটিকে খুঁজে পান। পরে, স্থানীয় উদ্যোগে মসজিদটির পরিষ্কার ও সংস্কার করা হয় এবং সেখানে আবার নামাজ আদায় শুরু হয়।
মসজিদটি খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নিয়ে এলাকায় নানা লোককথার ধারণা তৈরি হয়েছে। অনেকের মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছে যে, নাকি মসজিদটি অলৌকিকভাবে এক রাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখান থেকেই এর নাম হয়ে যায় ‘গায়েবি মসজিদ’। তথাপি, মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক উপাদানগুলো মুঘল আমলের নির্মাণশৈলীর সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইট ও সুড়কি দিয়ে নির্মিত মূল মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ২০ ফুট, এবং দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় চার ফুট। পুরোনো স্থাপনার রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ এবং দুই পাশে দুটি মিনার। গম্বুজ ও মিনারের চূড়ায় চাঁদ-তারার প্রতীক বিরাজমান। সংস্কারের পরে গম্বুজে সোনালী রং করা হয়েছে।
মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে কারুকাজ করা তিনটি দরজা। ভিতরের দেয়াল ও মেহরাবেও পুরোনো অলংকরণের চিহ্ন রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতি ও বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের কারণে কিছু প্রাচীন কারুকাজ হারিয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, একসময় পুরো এলাকা বড় বড় বেতঝোপ ও জঙ্গলে আচ্ছাদিত ছিল। পুরোনো প্রজন্ম থেকে তাঁরা শুনেছেন, সেই জঙ্গলের মধ্যেই মসজিদটি চাপা পড়ে ছিল। আশপাশের পরিবেশ এতটাই জঙ্গলাকীর্ণ ছিল যে বন্য প্রাণীর আতঙ্কও ছিল। মুসল্লিদের কেউ কেউ পালা করে পাহারা দিয়ে নামাজ আদায় করতেন, এসংক্রান্ত জানিয়েছেন স্থানীয় প্রবীণরা।
মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল্লাহ জানাচ্ছেন, পুরোনো মসজিদে তিন কাতারে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ জন মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল। তবে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯৯০ সালের পরে মসজিদের পরিসর বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রতি ওয়াক্তে অর্ধশতাধিক মানুষ নামাজ আদায় করেন। জুমার দিন মুসল্লির সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মসজিদের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিও রয়েছে। পুরোনো রেকর্ডে মুনশি এনায়েতউল্লাহর পক্ষ থেকে মসজিদের জন্য জমি দানের তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বর্তমানে মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং গুরুদাসপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ প্রাচীন এই স্থাপত্য দেখতে আসেন।
প্রথম থেকেই রোদ-বৃষ্টি, ঝড় ও সময়ের ক্ষয় সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকা বৃ-চাপিলা শাহী জামে মসজিদ আজও যেন হারিয়ে যাওয়া একটি জনপদ এবং মুঘল আমলের ইতিহাসের গল্প বলে চলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পুরোনো স্থাপত্যের স্মৃতি ধরে রাখা এই মসজিদটি সত্যিই নাটোরের ধর্মীয় ঐতিহ্যের, ইতিহাস এবং স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন