প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে গত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এখানে দেশের বৃহত্তম অ্যামিশ জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কারণে এই সম্প্রদায় মূলধারার সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হলেও তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
অ্যামিশ সম্প্রদায়ের সদস্যরা ধর্মীয় কারণে অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকলেও বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। সেন্ট জুড চিলড্রেনস রিসার্চ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. দিয়েগো হিজানো মন্তব্য করেন, “আমরা সবাই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত।” এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে টিকাদানের হার বেশি থাকায় মানুষ হাম থেকে যথেষ্ট সুরক্ষিত ছিলেন।
‘প্লেইন পিপল’ নামে পরিচিত অ্যামিশ ও মেনোনাইট সম্প্রদায়ের সদস্যরা সাধারণত সরকারি পদ গ্রহণসহ বিভিন্ন নাগরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না। তবে ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মধ্যে তারা নিয়মিত কেনাকাটা ও ব্যবসায়িক লেনদেন করেন। এই কাউন্টির শহরের কেন্দ্রের চারপাশে শহরতলি গড়ে উঠেছে, যেখানে অ্যামিশদের খামার রয়েছে।
অলাভজনক সংস্থা ‘ইউনিয়ন কমিউনিটি কেয়ার’-এর প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. অ্যান-মেরি ডেরিকো বলেন, “তাদের বিচ্ছিন্ন কোনো সম্প্রদায় হিসেবে ভাবার সুযোগ নেই।” ল্যাঙ্কাস্টার শহর ও আশপাশের এলাকায় সংস্থাটির বেশ কয়েকটি ক্লিনিক রয়েছে। পাশাপাশি একটি ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবাও রয়েছে। অ্যামিশ ও মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ‘প্লেইন হেলদি’ নামে এই কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
ডা. ডেরিকো জানান, “প্লেইন” সম্প্রদায়ের অনেক রোগী শহরে চিকিৎসা নিতে আসেন। শহরের অনেক বাসিন্দাও টিকা নেন না। তাদের সন্তানেরা অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে স্কুলে যায় এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়। পেনসিলভানিয়ায় সেপ্টেম্বরে হামের সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তা কিছুটা কমেছে। তবে শীতকালে ঘরের ভেতরে মানুষের জমায়েত বাড়লে সংক্রমণ আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা।
হামে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষের লক্ষণ মৃদু হলেও নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কে প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। এমনকি এসব জটিলতা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
অ্যামিশ ও মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পৌঁছাতে ‘ইউনিয়ন কমিউনিটি কেয়ার’ ছোট পরিসরে কয়েকটি টিকাদান কর্মসূচির আয়োজন করে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৪৫০ ডোজ হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। ডা. ডেরিকোর আশা, এই উদ্যোগ সংক্রমণ প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
যেসব এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানকার শিশুদের নির্ধারিত সময়ের আগেই টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করছে সংস্থাটির ক্লিনিকগুলো। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসরণ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি লরেন ও ম্যাসন স্পেন্স তাদের ১০ মাস বয়সী ছেলে বোয়েনকে নিয়ে একটি ক্লিনিকে আসেন। তারা ছেলেকে এমএমআর (হাম, মাম্পস ও রুবেলা) টিকার প্রথম ডোজ দিতে চেয়েছিলেন। অ্যামিশ বা মেনোনাইট সম্প্রদায়ের বাইরের এই পরিবারটি প্রায়ই কৃষিপণ্যের বাজারসহ বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে যাতায়াত করে।
লরেন স্পেন্স বলেন, “বিষয়টি ভীতিকর। এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।” কত দিন ধরে কাজ করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিশ বছর।”
নিউইয়র্কের অ্যামিশ সম্প্রদায়ের কয়েকটি স্কুল ও কয়েকজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, পেনসিলভানিয়া ও অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের মতো নিউইয়র্কেও যেন ধর্মীয় কারণে স্কুলে শিশুদের টিকা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
তবে ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির এলিজাবেথটাউন কলেজের ‘ইয়াং সেন্টার ফর অ্যানাব্যাপটিস্ট অ্যান্ড পাইটিস্ট স্টাডিজ’-এর পরিচালক স্টিভ নোল্টের মতে, অ্যামিশ সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতারা বিষয়টিকে ধর্মীয় সমস্যা হিসেবে দেখেন না। তিনি বলেন, “অ্যামিশদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা ঐতিহাসিক নথিপত্রে এমন কিছু নেই, যেখানে স্পষ্টভাবে টিকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে কিংবা এর বিরোধিতা করা হয়েছে।”
ইয়াং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টি ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৪৫ হাজার অ্যামিশ এবং ৬ হাজার ‘ওল্ড অর্ডার মেনোনাইট’ সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। নোল্টের বলেন, তাদের অনেকেই প্রচলিত ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর বেশি নির্ভর করেন এবং চিকিৎসকের কাছে খুব কম যান।
এবারের প্রাদুর্ভাবের আগে টেক্সাসসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন এলাকায় মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মধ্যে একই ধরনের হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নেওয়া, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারেন। এছাড়া ভাইরাসযুক্ত কোনো পৃষ্ঠ স্পর্শ করলেও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার ‘সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজ রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি’-এর পরিচালক মাইকেল অস্টারহোম বলেন, “সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতার দিক থেকে হাম সবচেয়ে শক্তিশালী রোগগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রে যারা হামের ঝুঁকিতে রয়েছেন, অর্থাৎ যারা টিকা নেননি বা আগে কখনো হামে আক্রান্ত হননি, তাদের কেউই নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারেন না। কেউই না।”
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে দেশটির কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের ৯২ দশমিক ৪ শতাংশ এমএমআর (হাম, মাম্পস ও রুবেলা) টিকা নিয়েছে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে এই হার ছিল ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ।
ল্যাঙ্কাস্টারের ফ্র্যাঙ্কলিন অ্যান্ড মার্শাল কলেজের গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক বারউড ইয়োস্ট বলেন, শিশুদের টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়ার জন্য শুধু অ্যামিশ সম্প্রদায়কে দায়ী করা ঠিক নয়। ২০২০ সাল থেকে পেনসিলভানিয়ার মধ্যাঞ্চলের সব কাউন্টিতেই টিকাদানের হার কমেছে। কেন্দ্রটির ২০২২ সালের এক জরিপে দেখা যায়, মেনোনাইট পরিবারের অধিকাংশই সন্তানদের টিকা দিয়েছেন। তবে অ্যামিশ পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই হার প্রতি ১০টিতে প্রায় ৩টি।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে অনীহা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো রয়ে গেছে। এতে গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ দুর্বল হয়েছে। কোনো এলাকায় পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থাকলে সংক্রামক রোগ সহজে ছড়াতে পারে না।
গত বছর পেনসিলভানিয়ায় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমএমআর টিকা নেওয়ার হার ছিল ৯৩ দশমিক ২ শতাংশ।
বার্তা সংস্থা এপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টিতে এই হার মাত্র ৮৮ শতাংশ। সেখানে সরকারি স্কুলের তুলনায় ধর্মীয় ও বেসরকারি স্কুলগুলোতে টিকা নেওয়ার হার আরো কম। এদিকে পেনসিলভানিয়ায় ধর্মীয় বা দার্শনিক কারণে বাধ্যতামূলক টিকা নেওয়া থেকে ছাড় পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে।
নোল্ট জানান, টিকা-বিরোধী কিছু গোষ্ঠী তাদের প্রচারণায় অ্যামিশ সম্প্রদায়কে ব্যবহার করেছে। ২০২১ সালে রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির এক মেলায় বক্তব্য দিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, সরকার অ্যামিশদের জোর করে টিকা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সচিব কেনেডি সম্প্রতি পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর জশ শাপিরোর সঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির কমিশনার অ্যালিস ইয়োডার বলেন, টিকা নিরাপদ ও কার্যকর, সরকারি কর্মকর্তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এই বার্তা প্রচার করা উচিত। পাশাপাশি মানুষকে টিকা নিতে উৎসাহিত করতে হবে। ১৯৯১ সালে পেনসিলভানিয়ায় হামের প্রাদুর্ভাবের সময় এই উদ্যোগ সফল হয়েছিল। তিনি বলেন, “তখন প্লেইন সম্প্রদায়ের মানুষজন দল বেঁধে এসে টিকা নিয়েছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন