প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হেনস্তা ও হয়রানির অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। তবে এবার কলকাতার একটি চলন্ত বাসে ত্রিপুরার এক বাঙালি তরুণীকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার কারণে পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টির খবর এসেছে। গত ১ জুন কলকাতার একটা চলন্ত বাসে এই ঘটনাটি ঘটেছিল। এর পরে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কারণে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।
বিভিন্ন মহল থেকে ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। জানা গেছে, কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ধরেই কলকাতায় বসবাসকারী ওই তরুণী সম্প্রতি একটি পাবলিক বাসে যাত্রা করছিলেন। বাসে চলার সময় তিনি ত্রিপুরার আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় কথা বলছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, তার কথাবার্তার ধরন ও টান শুনে বাসের কয়েকজন যাত্রী তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে মজা করতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে ওই তরুণী প্রকাশ্যে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। পরে সেই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণী দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলছেন যে তিনি ভারতের নাগরিক এবং কলকাতায় গত চার-পাঁচ বছর ধরে কর্মসূত্রে রয়েছেন। শুধু আঞ্চলিকতা বা ভিন্ন উচ্চারণে বাংলা বলার কারণে কাউকে ‘বাংলাদেশি’ বলে আখ্যা দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত—ভিডিওতে তিনি সেই প্রশ্নও তোলেন।
ওই তরুণী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ত্রিপুরা, আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বহু মানুষ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূত্রে বা পড়াশোনার জন্য বসবাস করে থাকে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ অঞ্চলের কথাধারণের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই কথা বলে। তাই ভাষার টানকে কেন্দ্র করে ভারতেরই একজন নাগরিককে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দেওয়া সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত ও অগ্রহণযোগ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের একাংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। অনেকেই মনে করছেন, দেশের এক প্রান্তের নাগরিককে শুধু ভাষা বা উচ্চারণের ভিত্তিতে এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু মানুষ ওই তরুণীর পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
ভিডিওর মন্তব্যের ঘরে অনেকেই নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা কর্মসূত্রে কলকাতায় গিয়ে অতীতেও তারা একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। ত্রিপুরার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার কারণে তাদেরও ‘বাংলাদেশি’ বলে সম্বোধন করে হেনস্তা করা হয়েছে। অনেকেই ওই তরুণীর সাহসী প্রতিবাদকে সমর্থন করেছেন। আবার কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের একটি অংশের মানুষের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও ভাষাগত বৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতার বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি আসাম-ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রতি ভারতের অন্য অঞ্চলে যে বিদ্বেষমূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে, তা নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভারতের নানা প্রান্তে ভাষা, চেহারা অথবা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু মানুষ হেনস্তার শিকার হয়েছেন। গত ডিসেম্বরে দেরাদুনে ত্রিপুরার এঞ্জেল চাকমার মৃত্যুর ঘটনাও দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। চেহারা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক আচরণের অভিযোগ ঘিরে তখনও ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতার বুকে চলন্ত বাসে এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন