প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশালে একের পর এক কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার 'মামলা-বাণিজ্য' ও চাঁদাবাজির অভিযোগে সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এবার জাতীয় নাগরিক পার্টির ছাত্রসংগঠন ‘ছাত্রশক্তি’র বরিশাল মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ডাকাতি মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি মারজুক আব্দুল্লাহর এমন অপতৎপরতায় সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে গোটা বরিশালবাসী।
গত বৃহস্পতিবার (০২ জুলাই) বরিশাল আদালতে বিএনপি-আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, মৃত ব্যক্তি, সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীসহ ২৪৮ জনের নাম উল্লেখ করে একটি নালিশি অভিযোগ দায়ের করেন মারজুক। অভিযোগ রয়েছে, আদালতে যাওয়ার আগেই মামলার ভয় দেখিয়ে শহরের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও হাসপাতাল মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
মামলায় ৪ মৃত ব্যক্তি ও বিএনপির নেতাকর্মী!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মারজুক আব্দুল্লাহর দায়ের করা মামলায় অন্তত চারজন মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যারা কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, গত ২২ জুন সন্ধ্যায় তারা গড়িয়ারপাড় এলাকায় ককটেল ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেছেন।
মৃত আসামিদের তালিকা
মোহাম্মদ আলী হাওলাদার (আসামি নং ১৯৫) বিসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, যিনি ২০২১ সালের ২৬ জুলাই মারা যান।
আবুল ফারুক হুমায়ুন (আসামি নং ১৯৮) মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি, মারা গেছেন ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ।
খন্দকার রেজাউর রহমান রেজা (আসামি নং ২১২) ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি, যিনি ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি মারা যান।
ইঞ্জিনিয়ার এইচএম হাফিজুর রশিদ শিবলী (আসামি নং ২২৫) ২২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মারা গেছেন ২০২১ সালের ২০ অক্টোবর।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের পাশাপাশি এই মামলায় বিএনপি নেত্রী ও সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রাশিদা পারভীন এবং মজিদা বোরহানসহ অসংখ্য নিরীহ ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য: এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি"
মামলার নথিতে গত ১০, ১৬ ও ২২ জুন তিন দফায় বিমানবন্দর থানাধীন কাশিপুর ও ভাঙারপোল এলাকায় সড়ক অবরোধ, ককটেল বিস্ফোরণ এবং গোপন বৈঠকের দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসন একে সম্পূর্ণ কাল্পনিক বলছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) বিমানবন্দর থানার ওসি (তদন্ত) সুমন কুমার আইচ বলেন,
নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই এলাকায় কোনো ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়নি। মামলার এজাহারের কোনো বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তি নেই।
প্রথমেই মামলাটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সরাসরি এফআইআর করার নির্দেশ না দিয়ে বিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
যেভাবে চলতো ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজি
বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর রাজিব হোসেন খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে অভিযোগ করেন,
এটি সম্পূর্ণ বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে পাতা একটি ফাঁদ। মারজুক আব্দুল্লাহ মামলার কপি আদালতে জমা দেওয়ার আগেই মোবাইল ফোনে ছবি তুলে বিভিন্ন জনের কাছে পাঠিয়ে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করছিলেন। যারা টাকা দিয়েছেন তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, আর যারা দেননি তাদের আসামি করা হয়েছে।
একইভাবে শহরের বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক ও স্বনামধন্য ব্যবসায়ীদের মামলার ভয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তবে মারজুক আব্দুল্লাহ এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, "সাক্ষীদের দেওয়া তথ্যের কারণে নিরীহ লোকজনের নাম এসেছে।"
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মারজুক আব্দুল্লাহ নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। ২০২৫ সালের ১৪ মে বরিশাল আদালতে একটি মামলা দায়ের করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার অভিযোগে তাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বরিশাল জেলার যুগ্ম সদস্যসচিব পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয়।
এর কিছুদিন পরই, ২০২৫ সালের ৬ জুন পটুয়াখালীর দুমকি এলাকায় দুই সহযোগীসহ ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হন মারজুক। সে সময় দুমকি থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) নূরুজ্জামান বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলা করেন এবং পুলিশ তাদের 'পেশাদার ডাকাত' হিসেবে আদালতে পাঠালে আদালত তাদের কারাগারে পাঠান। কিছুদিন জেল খেটে জামিনে বের হয়ে সিঅ্যান্ডবি রোডের সুলতান, রূপাতলীর জুয়েল এবং চাঁদমারির জহিরকে নিয়ে পুনরায় একটি 'মামলা-বাণিজ্য চক্র' গড়ে তোলেন মারজুক।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বরিশাল মহানগর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শাহেদ বলেন,
চাঁদাবাজি ও ডাকাতির অপরাধে মারজুককে অনেক আগেই সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সে একজন পেশাদার অপরাধী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা।
ডাকাতি মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হয়েও মারজুক কীভাবে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে শহরবাসীকে হয়রানি করছে, তা নিয়ে ক্ষুব্ধ বরিশালের আইনজীবী ও নাগরিক সমাজ। অনেকেই এই অপরাধ চক্রের সাথে বিমানবন্দর থানার সাবেক ওসি মিজানের যোগসূত্র থাকার সন্দেহ প্রকাশ করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
বরিশাল মেট্রোপলিটন আদালতের সরকারি আইন কর্মকর্তা (এপিপি) হাফিজ আহমেদ বাবলু বলেন, মামলায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা গুরুতর অপরাধ। আদালতের নির্দেশনায় পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করছেন। তদন্তে বাদীর জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় (মিথ্যা মামলা দায়েরের অপরাধ) আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন উল ইসলাম জানান,
এই যুবকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পুলিশ বিব্রত। তার বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলায় ওয়ারেন্ট রয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। তবে সে বর্তমানে গ্রেপ্তার আতঙ্কে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার মো. আশিক সাঈদ জানান, যেহেতু বিজ্ঞ আদালত মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, তাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন