প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে মেয়র প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত এর সাথে শেখর চন্দ্র দাস একান্ত মিটিংয়ে উপস্থিত।
বরিশাল নগরজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারী, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, করোনা সহায়তার নামে সাধারণ মানুষের অর্থ আত্মসাৎ এবং জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি হামলা ও অগ্নিসংযোগের একাধিক মামলার প্রধান অভিযুক্ত শেখর চন্দ্র দাসকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বরিশাল মহানগরীর নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য এবং সেই অবৈধ কালো টাকায় কুয়াকাটায় গড়ে তোলা আলিশান পাঁচতলা হোটেলের খবর এখন পুরো দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দুঃশাসন, রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার এবং কীভাবে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া হয়েছিল, শেখর চন্দ্র দাসের এই পুরো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তারই এক নগ্ন ও বাস্তব বহিঃপ্রকাশ।
করোনা মহামারির দুর্যোগে মানুষকে সরকারি অর্থ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ পার্থ লোপাট করে। করোনাভাইরাস মহামারির মতো একটি বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকটকালীন সময়েও শেখর চন্দ্র দাস নিজের লোভ ও পৈশাচিক মানসিকতা সংবরণ করতে পারেননি। মহামারির কারণে যখন সারা দেশের মানুষ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিল, তখন সরকার থেকে পাঠানো আর্থিক সহায়তা বা ত্রাণের চাল অসহায় মানুষের মাঝে পাইয়ে দেওয়ার নাম করে তিনি প্রতারণার জাল বিছানেন। সহায়তার প্রত্যাশায় থাকা দিনমজুর, গরিব ও দুস্থ মানুষের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিয়ে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। সংকটের দিনে সাধারণ মানুষের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়ানোর বদলে তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অর্থ আত্মসাতের এই লোমহর্ষক ঘটনাটি সেই সময়ে এলাকায় চরম জনরোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
মহসিন মার্কেট থেকে শুরু করে পানির দোকান—বাদ যায়নি কিছুই স্থানীয় সচেতন মহল, ব্যবসায়ী সমাজ এবং প্রাপ্ত বিভিন্ন অভিযোগের গভীরে গেলে দেখা যায়, বিগত সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন শেখর চন্দ্র দাস দলীয় পদ ও বড় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে নগরীর প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকাগুলোতে একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। নগরীর অত্যন্ত ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র মহসিন মার্কেটে তাঁর নির্দেশে চলত ব্যাপক ও নিয়মিত চাঁদাবাজি। এছাড়া স্টিমার ঘাট এলাকা, কাঁচাবাজার, বাটার খাল এলাকা থেকে শুরু করে নগরীর অলিগলির ছোট্ট একটি পানির দোকান পর্যন্ত তাঁর চাঁদাবাজির রোশনল থেকে রেহাই পায়নি। প্রতিটি দোকানদারকে তাঁর নির্ধারিত চাঁদা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, অন্যথায় দোকান ভাঙচুর কিংবা মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হতো। একাধিক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আতঙ্কিত হয়ে আজও মুখ খুলতে না পারলেও তাঁর এই চাঁদাবাজির ভয়ংকর ইতিহাস সবারই জানা।
পবিত্র রমজানেও হকারদের ছাড় দেননি এই চাঁদাবাজ শেখর চন্দ্র দাসের চাঁদাবাজির নির্মমতার মাত্রা এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, পবিত্র রমজান মাসের মতো সংযমের সময়েও তিনি সাধারণ হকারদের ছাড়েননি। ইফতার ও সেহরির জোগাড় করতে যখন ফুটপাথের গরিব হকারা একটু বাড়তি আয়ের আশায় বসেছিলেন, তখন তাঁদের ওপরও নিয়মিত চাঁদার দাবি চাপিয়ে দেওয়া হতো। রমজানের পবিত্রতাকে তোয়াক্কা না করে হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হতো। ফুটপাথে ছোট ব্যবসা পরিচালনা করা এসব অসহায় মানুষ টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো।
সিটি করপোরেশন এলাকাসহ প্রধান সড়কগুলোতে হকারদের ওপর প্রতিদিনের জুলুম বরিশাল সিটি করপোরেশনের সামনের প্রধান সড়ক, হকারদের বসার নির্দিষ্ট স্থান এবং আশেপাশের জনবহুল ফুটপাথগুলো থেকে প্রতিদিন নিয়মিত নগদ চাঁদা আদায় করা হতো শেখর চন্দ্র দাসের ইশারায়। দিনভর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে হকাররা যা আয় করতেন, তার একটি বড় অংশ চলে যেত এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের পকেটে। প্রতিবাদ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিল না, কারণ প্রতিবাদ করলেই হকারদের উচ্ছেদ করা হতো এবং মারধর করা হতো।
বহিষ্কারের পরও থামেনি ক্ষমতার অপব্যবহার ও নতুন বলয় তৈরি চাঁদাবাজির এই লাগামহীন দৌরাত্ম্য ও সীমাহীন অপরাধের মাত্রা যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন বাধ্য হয়ে তৎকালীন বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ তাঁকে দলীয় পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার মোহে অন্ধ শেখর চন্দ্র দাস দমে যাননি। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও তিনি থেমে থাকেননি; বরং রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তিনি পরবর্তীতে খোকন সেরনিয়াবাতের রাজনৈতিক বলয়ে ভিড়ে যান এবং নিজের প্রভাব ধরে রাখতে নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরি করেন। পরবর্তীতে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে সরাসরি পেশিশক্তি প্রদর্শন, প্রভাব বিস্তার এবং ভোটের বাক্সে নানা অনিয়ম ও কারচুপির সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং একের পর এক গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার পরও রাজনৈতিক আশীর্বাদের জোরে তিনি সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছিলেন।
চাঁদাবাজির টাকায় কুয়াকাটায় পাঁচতলা হোটেল ও বর্তমান নিরাপদ আশ্রয়স্থল অনুসন্ধানে আরও সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিগত বছরগুলোতে নগরীর রাজপথ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্র থেকে চাঁদাবাজির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া কোটি কোটি টাকার একটি বিশাল অংশ অবৈধ উপায়ে পাচার করা হয় পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত এলাকায়। সেখানে ‘হোটেল সি-গাল’ নামে একটি আলিশান পাঁচতলা ভবন বা আবাসিক হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে, যার প্রকৃত মালিক শেখর চন্দ্র দাস ও তাঁর পরিবার। সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন এই দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন নির্মাণের মূল উৎসই হলো বরিশালের সাধারণ মানুষের পকেট কাটা কালো টাকা। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে থাকা শেখর চন্দ্র দাস সেই পাঁচতলা হোটেলকেই নিজের অত্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানিয়ে সেখানে আরাম-আয়েশে বসবাস করছেন। শুধু তাই নয়, কুয়াকাটার এই বিলাসবহুল হোটেলে বসেই তিনি নিজের ফেসবুক আইডি এবং বেনামি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারবিরোধী ও নানা উসকানিমূলক রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন। বরিশাল নগরীতে হঠাৎ করে ঝটিকা মিছিল বের করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর পর যেসব ক্যাডাররা পালিয়ে বেড়ায়, তাদের অনেকে কুয়াকাটার এই হোটেলেই নিরাপদ আশ্রয় নেয়। দলীয় কার্যক্রমে প্রকাশ্যে রাজপথে দেখা না গেলেও পর্দার আড়ালে থেকে শেখর চন্দ্র দাস এসব বিশৃঙ্খল কার্যক্রমে গোপনে বিপুল অঙ্কের অর্থ জোগান দিয়ে আসছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও মামলার কঠোর আইনি অবস্থান আইনি ও প্রশাসনিক দিক থেকেও শেখর চন্দ্র দাস একজন চিহ্নিত ও মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলন দমাতে চালানো হামলা এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততার জোরালো প্রমাণ মিলেছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বরিশাল টাউন হল এলাকার বিএনপি কার্যালয়ে সরাসরি অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও নজিরবিহীন তাণ্ডব চালানোর মূল হোতাদের একজন ছিলেন তিনি। এই সুনির্দিষ্ট ঘটনায় বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আজ কিছু কুচক্রী মহল আইনি মারপ্যাঁচ, প্রশাসনিক নথি বা আদালতের রায়ের দীর্ঘসূত্রতার অজুহাত দেখিয়ে এই সমস্ত অপরাধ ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়কে আড়াল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু কুয়াকাটায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ওই পাঁচতলা বহুতল ভবনটিই হলো শেখর চন্দ্র দাসের বহু বছরের জুলুম, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির সবচেয়ে বড় জীবন্ত ও দৃশ্যমান প্রমাণ। কাগজের নথির বাহানা দিয়ে জুলাই-আগস্টের গণহত্যাকারী ও চাঁদাবাজদের বাঁচানোর এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এ বিষয় অভিযুক্ত শেখর চন্দ্র দাসের সাথে যোগাযোগের জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তাঁর অফিশিয়াল বা ব্যক্তিগত মেসেঞ্জারে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া বা জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে এই বিষয়ে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম তালাশ বিডিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, শেখর চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর মামলা রয়েছে এবং তাঁকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বাত্মক অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন