প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাবার মরদেহ তখনো বাড়িতে ছিল। চারপাশে স্বজনদের কান্না এবং শোকের মাতম ছিল। এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মধ্যেও বাবার স্বপ্ন পূরণের আশায় যশোরের বেনাপোলের মেধাবী শিক্ষার্থী আফিয়া মাসুমা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। বুকভরা কষ্ট এবং চোখের জল নিয়ে একের পর এক পরীক্ষা শেষ করে অবশেষে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ গ্রেড অর্জন করেছেন তিনি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তার এই সাফল্য পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের জন্য আনন্দের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আফিয়া মাসুমা শার্শা উপজেলা কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি বেনাপোল পোর্ট থানার নামাজ গ্রামের প্রয়াত ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক আব্দুস সামাদের ছোট মেয়ে। মৃত আব্দুস সামাদ (৬৪) ছিলেন বেনাপোলের মেসার্স তাজমহল ট্রান্সপোর্ট ও হাজী মুছা করিম অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী।
আফিয়া মাসুমার চাচা গফুর জানান, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় আব্দুস সামাদ স্ট্রোকজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু ঘটে। ওই রাতেই মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরদিন সকালে বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখেই বেনাপোল কলেজ কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যান মাসুমা। মেয়ের পরীক্ষার কথা বিবেচনা করে পরিবারের সদস্যরা তার বাবার দাফনের সময় পিছিয়ে দেন। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফিরে বাবার দাফনে অংশ নেন মাসুমা। এরপর বাবাকে হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়েই বাকি পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করেন তিনি।
ফলাফল প্রকাশের পর আবেগাপ্লুত মাসুমা জানান, তার বাবা সব সময় চাইতেন তিনি ভালো ফলাফল করুক। পরীক্ষার সময় বাবাকে হারানো ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
মাসুমা বলেন, ‘আমি আরও ভালো ফলাফল করতে পারতাম। পরীক্ষার খাতায় লিখতে গিয়ে বারবার বাবার মুখটা ভেসে আসছিল। বাবা বেঁচে থাকলে আমার এই ফলাফল দেখে খুব খুশি হতেন।’
বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে মাসুমা জানান, ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে চান তিনি।
শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হাসানউজ্জামান বলেন, মাসুমা শুরু থেকেই মেধাবী এবং পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। তার ভালো ফলাফলের বিষয়ে শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল। বাবার মৃত্যুর মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ গ্রেড অর্জন করা তার মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলে মাসুমা জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারত বলে আমাদের বিশ্বাস। আমরা তার ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করি।’
শার্শা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাবাকে হারানোর শোক নিয়েও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাসুমার ভালো ফলাফল করা প্রশংসনীয়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তার পরিবার সহযোগিতা চাইলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে। বাবার মৃত্যুর পরদিনই পরীক্ষার হলে বসা, বুকের ভেতর অসহনীয় কষ্ট নিয়ে পরীক্ষা শেষ করা; সবকিছু পেরিয়ে মাসুমার এই ফলাফল শুধুমাত্র একটি শিক্ষাগত অর্জন নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব ও স্বপ্নের প্রতি অবিচল থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাবা নেই, কিন্তু বাবার স্বপ্ন বেঁচে আছে মেয়ের হৃদয়ে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন