প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জহির রায়হানের নামে ছাত্রাবাস, জন্মদিনে নেই কোনো আয়োজন—কেন?
জন্মদিনে নেই আলোচনা সভা, সেমিনার বা চলচ্চিত্র প্রদর্শনী; শিক্ষার্থীদের পর্ব সমাপনী পরীক্ষা চলায় এবারও নেওয়া যায়নি উদ্যোগ
বাংলাদেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা জহির রায়হান। ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুরে জন্ম নেওয়া এই চলচ্চিত্রকারের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে জীবন থেকে নেয়া ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড।
তাঁর নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্মারক, প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে। রাজধানীর ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একটি ছাত্রাবাসও বহন করছে তাঁর নাম—জহির রায়হান ছাত্রাবাস। তবে প্রশ্ন উঠেছে, যে হলের নামকরণই করা হয়েছে একজন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ও লেখকের স্মৃতিকে ধারণ করে, সেখানে তাঁর জীবন, কর্ম ও ইতিহাস নিয়ে নিয়মিত স্মরণচর্চা কতটা হচ্ছে? একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নামে ছাত্রাবাসের নামকরণ কি শুধু নামফলকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তাঁর জীবন ও কর্মও শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হবে?
বিশেষ করে ১৯ আগস্ট তাঁর জন্মদিনে জহির রায়হান হলের উদ্যোগে আলোচনা সভা, সেমিনার, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী কিংবা শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো বিশেষ আয়োজন না থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। এছাড়াও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এর একমাত্র সাংস্কৃতিক সংগঠন ডিপিআই কালচারাল ক্লাবের উদ্যোগেও কোন কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি।
প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল তাঁর চলচ্চিত্র
জহির রায়হান শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন লেখক ও সাংবাদিকও। মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মিত স্টপ জেনোসাইড তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাঁর চলচ্চিত্র ও সাহিত্যকর্মে সমাজ, রাজনীতি, বৈষম্য ও মানুষের জীবন উঠে এসেছে নানা মাত্রায়। ফলে তাঁর নামে পরিচালিত একটি ছাত্রাবাসে তাঁর কর্ম ও চিন্তাকে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হলে তা শুধু স্মরণ অনুষ্ঠান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চারও অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্তর্ধান আজও আলোচনার বিষয়
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরে নিখোঁজ হন জহির রায়হান। এরপর তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁর অন্তর্ধান বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যাবৃত ঘটনাগুলোর একটি।
জহির রায়হানের শেষ দিনের ঘটনা ও মিরপুরে যাওয়ার কারণ নিয়ে বিভিন্ন সময় তাঁর পরিবারের সদস্য ও গবেষকদের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিবরণে ঘটনাটির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে; তবে তাঁর অন্তর্ধানের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নিয়ে এখনও নানা মত ও বিতর্ক রয়েছে।
এ কারণে জহির রায়হানের জীবন, মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ড এবং অন্তর্ধানের ইতিহাস নিয়ে তথ্যনির্ভর আলোচনা নতুন প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ইতিহাস ও সংস্কৃতিচর্চায় আগ্রহীরা।
এবারও উদ্যোগ নেওয়া যায়নি কেন?
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের চলমান পর্ব সমাপনী পরীক্ষা থাকায় জহির রায়হানের জন্মদিন উপলক্ষে বড় কোনো আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো কার্যক্রমও নেওয়া যায়নি।
তবে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছে, পরীক্ষা চললেও পরবর্তী সময়ে হল প্রশাসনের উদ্যোগে একটি স্মরণসভা বা সেমিনার আয়োজন করা সম্ভব। এতে একদিকে জহির রায়হানের প্রতি সম্মান জানানো হবে, অন্যদিকে তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জানার সুযোগ তৈরি হবে।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
জহির রায়হান হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য, নামে যাঁকে স্মরণ করা হয়েছে, তাঁর সম্পর্কে জানার সুযোগও তৈরি করা উচিত। শুধু আবাসিক সুবিধা প্রদান নয়, ছাত্রাবাসগুলো শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে জহির রায়হান হল প্রশাসন ও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে তাঁর জন্মদিন ও অন্তর্ধান দিবস উপলক্ষে নিয়মিত কর্মসূচি গ্রহণ করবে।
কারণ, একজন ব্যক্তিত্বের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তাঁর আদর্শ, কর্ম ও ইতিহাসও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রতিবছর তাঁর জন্মদিন, অন্তর্ধান দিবস কিংবা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে আলোচনা সভা, সেমিনার, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, বই পাঠ বা রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীরা তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ পেতে পারে।
বিশেষ করে স্টপ জেনোসাইড বা তাঁর অন্যান্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, চলচ্চিত্র ও সাংবাদিকতার ইতিহাসকে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব।
জহির রায়হানের জন্মদিন ১৯ আগস্ট এই দিনটি তাই শুধু একটি জন্মতারিখ নয়; ঢাকা পলিটেকনিকের জহির রায়হান হলের জন্য এটি হতে পারে তাঁর জীবন, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা ও অন্তর্ধানের ইতিহাস নতুন করে জানার একটি উপলক্ষ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন