প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দ্বারা শুরু হওয়া যুদ্ধ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। লড়াইটি শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে এক ধরনের স্থবিরতায় পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমানে যা প্রকাশিত হচ্ছে তা একেবারেই নতুন, এবং এই পরিস্থিতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে- তা একটি বড় অজানা প্রশ্ন।
আমাদের পশ্চিমে একটি বিশাল শক্তির উত্থান ঘটছে। বহু দশক ধরে নিষেধাজ্ঞায় বন্দি থাকা এবং ক্রমাগত যুদ্ধের হুমকিতে থাকা ইরান ১৯৭৯ সালের পর থেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে আমেরিকা তার সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে যখন নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করেছে, তখন নিষেধাজ্ঞার দেয়ালের পেছনে বন্দী থাকা সেই দেশটি এখন এই অঞ্চলের একটি উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
এই দিক থেকে চিন্তা করলে, ইরানের বর্তমান অবস্থা মার্কিন-চীন শীতল যুদ্ধকালীন উত্তেজনা শিথিলের পর (ডিটাঁত) চীনের সাথে যা ঘটেছিল তার মতো। ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে চীনকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এভাবে কোণঠাসা ও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। 'ডিটাঁত' ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের সমঝোতামূলক পুনর্বাসনের সূচনা, এবং এর পর থেকে নেওয়া অভ্যন্তরীণ সংস্কারগুলোই চীনকে আজকের বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করেছে।
তবে দুটি প্রধান জায়গায় ইরানের গল্পটি চীনের চেয়ে আলাদা। প্রথমত, ইরান কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তি হতে যাচ্ছে না; তবে বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে সে নিশ্চিতভাবেই আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক সম্প্রদায়ে ইরানের পুনঃপ্রবেশ চীনের চেয়ে অনেক বেশি বিশৃঙ্খল হবে, কারণ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যে নির্বাসনে তাকে পাঠানো হয়েছিল, সেখান থেকে তাকে লড়াই করেই বেরিয়ে আসতে হয়েছে।
অবকাঠামো ধ্বংসের মতো মারাত্মক কোনো চেষ্টা ছাড়া অঞ্চলে পরাশক্তি হিসেবে ইরানের এই উত্থান ঠেকানো এখন অসম্ভব।
তবে এই উত্থান প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, যা একটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল এবং সম্ভবত সহিংস রূপ নিতে পারে। এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে ইরানের ভেতরের কোন গোষ্ঠীটি ক্ষমতার শীর্ষে ওঠে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাশ টেনে ধরে তার ওপর। চীনের ক্ষেত্রে, ডেন জিয়াওপিংয়ের মতো সংস্কারমুখী গোষ্ঠী নেতৃত্ব হাতে নেওয়ার আগেই কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে এক বড় ধরনের বোঝাপড়া ও রাজনৈতিক লড়াই ঘটেছিল। ১৯৬৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও ডেন জিয়াওপিংয়ের বহিষ্কার, ১৯৭১ সালে লিন বিয়াওর ব্যর্থ অভ্যুত্থান ও মঙ্গোলিয়ায় বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু, চৌ এনলাইয়ের উত্থান এবং তার বিপক্ষে 'গ্যাং অব ফোর'-এর অবস্থান, চৌ এনলাইয়ের মৃত্যুর পর ডেনের দ্বিতীয়বার বহিষ্কার এবং পরিশেষে ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর ডেনের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন—এসব মিলিয়ে চীনের সেই পথটি ছিল চরম সংকটময়।
ঠিক তখনই চীন দৃঢ়তার সাথে সংস্কারের পথে হেঁটে মাওয়ের মতাদর্শের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর তারা ধীরে ধীরে এবং সতর্কতার সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়। সেই পথ ধরেই কয়েক দশক পর চীন বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে ওঠে।
ইরান এখন তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের ঠিক একই রকম একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্রিম লিডার আলী খামেনির মৃত্যু এবং জিয়োনিস্ট মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের বিরুদ্ধে জয়ের পর ইরানকে এখন অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দলের মুখোমুখি হতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে- তারা কি অতীতে আঁকড়ে থাকবে নাকি নতুন কোনো ভবিষ্যতের দিকে যাবে? এই প্রক্রিয়াটি উন্মোচিত হতে বহু বছর সময় লাগবে। তবে চীনের সাথে ইরানের মূল পার্থক্য হলো—ইরানের এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি ঘটছে একটি যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে।
এটা স্পষ্ট যে ইরানের ভেতরে একটি প্রাগমেটিক বা বাস্তববাদী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা চায় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটুক এবং দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হোক। কিন্তু অন্যদিকে আরেকটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে আক্রমণকারীদের এক অপমানজনক পরাজয় উপহার দিতে চায়। তারা আফগানিস্তানে তালেবানরা যেভাবে মার্কিনিদের তাড়িয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যেও সেভাবে মার্কিন বাহিনীকে তড়িঘড়ি ও বিশৃঙ্খলভাবে পালানোর পথ নিশ্চিত করতে চায়।
প্রকৃত খেলা শুরু হবে ঠিক এর পর। মার্কিনিরা এ অঞ্চল ছেড়ে চলে গেলে ইরানি সামরিক মেশিন তাদের নজর ঘোরাবে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর দিকে। সেখানে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয় আসবে। যুদ্ধের বিল তো ইতিমধ্যেই পেশ করা হয়ে গেছে! ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি 'ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস'-কে বলেছিলেন, জুন মাসের যুদ্ধে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক আলোচনায় ফেরার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমেরিকা তখন সেই দাবিকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর ২০২৬ সালের মার্চে আমেরিকার কাছে দেওয়া নিজেদের পাল্টা প্রস্তাবে ইরান আবারও একই দাবি তোলে। এপ্রিলে তারা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করে ২৭০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের জুনের মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকে বেড়ে ৩০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
এখন আর কারো এই দাবিকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। হরমুজের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান আগামী দিনগুলোতে এই দাবি আরও জোরদার করবে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন দেখবে এই সংঘাত তাদের কোনো স্বার্থ পূরণ করছে না, তখন তারা সরে যাবে এবং এই বিপুল বিল পরিশোধের ভার এসে পড়বে উপসাগরীয় রাজাদের কাঁধেই। আর তারা যখন এই অঙ্ক মিটিয়ে দেবে, তখন আবার নতুন দাবি আসবে, তারপর আরও একটি।
জিয়োনিস্ট জোট যদি পুরো দেশের অবকাঠামো ধূলিসাৎ করে দেওয়ার মতো কোনো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ না চালায়, তবে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরানের উত্থান এখন ঠেকানো অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ধরণের ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপের সম্ভাবনা কম হলেও একে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরাশক্তি হওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই চলমান। হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার পর, তারা এবার উপসাগরীয় রাজাদের অপরিসীম ধন-সম্পদের দিকে নজর দেবে-যে সম্পদ এখন চরম ঝুঁকিতে।
চীনের গল্পটি এখানে শিক্ষণীয়, কারণ এটি আমাদের দেখায় কীভাবে একটি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র বিশ্ববাণিজ্য, অর্থায়ন এবং কূটনীতিতে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পারে। ইরান কি এই মুহূর্তটিকে একইভাবে কাজে লাগাবে, নাকি নিজেদের সামরিক সুবিধাকে শেষ সীমা পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার চেয়ে অতীত প্রতিশোধেই মগ্ন থাকবে- সেটিই এখনকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
নিবন্ধের লেখক খুররাম হুসেইন, অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন