প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ, যেমন নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং গর্ভবতী নারীরা এই সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। শরীরে আয়রনের ঘাটতি রক্তস্বল্পতার অন্যতম কারণ, যা Iron Deficiency Anaemia (IDA) নামে পরিচিত।
হিমোগ্লোবিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আয়রন কাজ করে। এটি রক্তের মাধ্যমে ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সেল বা টিস্যুতে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। শরীরে আয়রনের অভাব হলে হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়, যা ক্লান্তি, দুর্বলতা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আয়রনের ঘাটতি অনেক সময় ধীরে ধীরে কয়েক মাস বা বছর ধরে তৈরি হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে রোগটি বুঝতে পারেন না। যদি সময়মতো রোগটি শনাক্ত ও চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা, কর্মজীবন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নারী ও পুরুষের মধ্যে কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বাংলাদেশে আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই বিদ্যমান। তবে প্রজননক্ষম নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের মাধ্যমে রক্তক্ষরণ, অতিরিক্ত মাসিক, গর্ভাবস্থায় আয়রনের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন গর্ভধারণের কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কিশোরীদের দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি, মাসিক শুরু হওয়া এবং পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি আয়রনের চাহিদা ও ঘাটতির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। গর্ভাবস্থায় গুরুতর রক্তস্বল্পতা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে, পুরুষদের মধ্যেও আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা যায়। অপর্যাপ্ত আয়রন গ্রহণ, পরিপাকতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ, পাকস্থলী বা অন্ত্রের আলসার, কিছু অন্ত্রের রোগ এবং আয়রন শোষণে সমস্যা এর সম্ভাব্য কারণ।
বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের আয়রন ঘাটতি শনাক্ত হলে শুধু আয়রন ট্যাবলেট দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং রক্তক্ষরণ বা অন্য কোনো অন্তর্নিহিত রোগ রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা জরুরি।
বাংলাদেশের ২০১১–১২ সালের জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপে ১৫–৪৯ বছর বয়সী গর্ভবতী নন ও স্তন্যদান করছেন না—এমন নারীদের মধ্যে আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার হার ছিল ৪.৮ শতাংশ। তবে পুরুষ ও নারীর বর্তমান অবস্থার তুলনা করতে সমসাময়িক, প্রতিনিধিত্বশীল তথ্য প্রয়োজন।
আয়রন ঘাটতির প্রধান কারণ
আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো—
১. আয়রনসমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ না করা।
২. অতিরিক্ত মাসিক বা অন্য কোনো কারণে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ।
৩. গর্ভাবস্থা ও শৈশব-কৈশোরে আয়রনের চাহিদা বৃদ্ধি।
৪. হুকওয়ার্মসহ কিছু পরজীবীর সংক্রমণের কারণে রক্তক্ষরণ।
৫. পাকস্থলী ও অন্ত্রের রোগের কারণে আয়রন শোষণে সমস্যা।
৬. দীর্ঘদিনের অপুষ্টি এবং খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্যের অভাব।
৭. কিছু ক্ষেত্রে পরিপাকতন্ত্রের গুরুতর রোগ, এমনকি ক্যানসারের কারণে গোপন রক্তক্ষরণ।
লক্ষণগুলো কী?
আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার সাধারণ লক্ষণ হলো—
অল্পতেই ক্লান্তি ও দুর্বলতা।
মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা।
অল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট।
বুক ধড়ফড় করা।
ত্বক ও চোখের নিচের অংশ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া।
চুল পড়া এবং নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া।
কখনো বরফ, মাটি বা অখাদ্য বস্তু খাওয়ার অস্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।
তবে এসব লক্ষণ অন্য রোগেও দেখা দিতে পারে। তাই শুধুমাত্র লক্ষণের ভিত্তিতে আয়রন ঘাটতি নির্ণয় করা উচিত নয়।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়।
১. Complete Blood Count (CBC): হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, MCV, MCH এবং অন্যান্য রক্তকণিকার সূচক মূল্যায়ন করা হয়। আয়রন ঘাটতিতে MCV ও MCH কম থাকতে পারে, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে এগুলো স্বাভাবিকও থাকতে পারে।
২. Serum Ferritin: শরীরে সঞ্চিত আয়রনের পরিমাণ বোঝার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ফেরিটিন কম থাকলে আয়রন ঘাটতির পক্ষে জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে সংক্রমণ বা প্রদাহের কারণে ফেরিটিন স্বাভাবিক কিংবা বেশি থাকতে পারে।
৩. অন্যান্য পরীক্ষা: প্রয়োজন অনুযায়ী Transferrin Saturation (TSAT), CRP, রেটিকুলোসাইট কাউন্ট, পেরিফেরাল ব্লাড ফিল্ম এবং রক্তক্ষরণের সম্ভাব্য উৎস অনুসন্ধানের পরীক্ষা করা হতে পারে।
রোগীর বয়স, লিঙ্গ, উপসর্গ ও চিকিৎসার ইতিহাস বিবেচনা করে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা
আয়রন ঘাটতি প্রতিরোধে সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দৈনন্দিন খাবারে রাখা যেতে পারে—
মাছ, মাংস ও উপযুক্ত ক্ষেত্রে কলিজা।
ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার।
গাঢ় সবুজ শাকসবজি।
আয়রনসমৃদ্ধ বা আয়রন দিয়ে সমৃদ্ধ করা খাবার।
ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল, যেমন পেয়ারা, লেবু ও কমলা।
প্রাণিজ উৎসের আয়রন সাধারণত উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রনের তুলনায় সহজে শোষিত হয়। উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রনের সঙ্গে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার খেলে আয়রন শোষণ বাড়তে পারে। খাবারের সঙ্গে চা বা কফি পান করলে আয়রন শোষণ কমতে পারে; তাই খাবারের কিছুটা আগে বা পরে এগুলো পান করা ভালো।
শুধু আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেলেই সব ধরনের রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করা যায় না। ভিটামিন বি১২, ফলেটের ঘাটতি, থ্যালাসেমিয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণেও রক্তস্বল্পতা হতে পারে।
চিকিৎসা ও করণীয়
আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার চিকিৎসায় সাধারণত মুখে খাওয়ার আয়রন দেওয়া হয়। রোগীর অবস্থা, আয়রনের ঘাটতির মাত্রা, সহনশীলতা এবং শোষণক্ষমতা বিবেচনা করে চিকিৎসক ওষুধের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করেন।
যাঁরা মুখে আয়রন সহ্য করতে পারেন না, যাঁদের আয়রন শোষণে সমস্যা রয়েছে অথবা যাঁদের দ্রুত আয়রন পূরণের প্রয়োজন, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিরায় আয়রন দেওয়া যেতে পারে।
চিকিৎসার পাশাপাশি আয়রন ঘাটতির মূল কারণ খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ চলতে থাকলে শুধু আয়রন গ্রহণ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া উচিত নয়। সব ধরনের রক্তস্বল্পতায় আয়রন উপকারী নয়, আর অতিরিক্ত আয়রন শরীরের ক্ষতি করতে পারে।
জনসচেতনতা বাড়াতে হবে
একই সঙ্গে পুরুষদের রক্তস্বল্পতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের আয়রন ঘাটতি দেখা দিলে সম্ভাব্য গোপন রক্তক্ষরণ বা অন্য কোনো রোগের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
উপসংহার
আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব।
লেখক: ডা. শারমিন ইয়াসমিন
রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন