শুক্রবার, ১৬ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৯:১৭ এম
মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধ চলাকালীন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন মিন অং হ্লাইং, যিনি সামরিক শাসক থেকে প্রেসিডেন্টে পরিণত হয়েছেন। একসময় যিনি আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে দূরে রাখা হয়েছিল, এখন সেই নেতাকে একের পর এক দেশ স্বাগত জানাচ্ছে। সর্বশেষ মালয়েশিয়া সফরে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলো এখন বাস্তব স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেলেও গৃহযুদ্ধ অবসানের কোনো স্পষ্ট পথ তৈরি হচ্ছে না।
গত সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়া মিন অং হ্লাইংকে সফরের আমন্ত্রণ জানালে দেশটি স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, এর অর্থ তার সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়। সফরের উদ্দেশ্য ছিল মালয়েশিয়ায় থাকা মিয়ানমারের শরণার্থী ও অভিবাসীদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান, এমনটাই জানিয়েছিলেন দেশটির এক কর্মকর্তা। কিন্তু গত সপ্তাহে কুয়ালালামপুরে পৌঁছালে সাবেক এই জেনারেলকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও সামরিক গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজের পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, মিয়ানমার নিজ খরচে তাদের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। শরণার্থীবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে মালয়েশিয়ায়, তাই এই ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটিতে মিয়ানমারের প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার নাগরিক রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নিপীড়িত রোহিঙ্গা মুসলিম জনগণের সদস্য।
মিন অং হ্লাইং জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে তিনি নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠাবেন।
অন্যদিকে, মিয়ানমারকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১ সদস্যের আঞ্চলিক জোট আসিয়ানে পুনরায় সম্পৃক্ত করতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। সহিংসতা বন্ধ ও সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসিয়ান যে পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না করায় মিন অং হ্লাইংকে জোটের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। মালয়েশিয়া ওই পরিকল্পনার অন্যতম জোরালো সমর্থক ছিল।
আনোয়ার ইব্রাহিম সাংবাদিকদের বলেন, মিয়ানমারকে কোনো ধরনের পক্ষপাত ছাড়াই আসিয়ানসহ জাতিগুলোর বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে ফিরিয়ে আনতে মালয়েশিয়া যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।
মিয়ানমারে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চলা গৃহযুদ্ধে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর হিসাবে প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অন্তত ৩৫ লাখ। সংঘাত এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে।
মিন অং হ্লাইং গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তাকে আতিথ্য দেওয়া পঞ্চম আসিয়ান দেশ মালয়েশিয়া। এর আগে তিনি থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওস সফর করেন। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর তিনি প্রেসিডেন্ট হন। ওই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলোকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
মালয়েশিয়া সফর শেষে তার মুখপাত্র জানিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনেই সফর করতে পারেন তিনি।
নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সম্মানসূচক গবেষক ব্রিজেট ওয়েলশের মতে, মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে মালয়েশিয়া জান্তাবিরোধী অবস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও যেসব আঞ্চলিক নেতা তাকে স্বাগত জানাচ্ছেন, তারা মানবাধিকারের চেয়ে বাস্তব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
ওয়েলশ বলেন, আসিয়ান ও মিয়ানমার—উভয়ের জন্যই এটি এক ধাপ পেছনে যাওয়ার মতো। এতে মিয়ানমারের সংকট সমাধানের কোনো বাস্তব পথ তৈরি হচ্ছে না। বরং সামরিক বাহিনীকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে সংকট আরো বাড়তে পারে। দেশের ভেতরে যে বৈধতা সামরিক বাহিনীর নেই, বিদেশি সফরের মাধ্যমে তারা সেই স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চেষ্টা
মিন অং হ্লাইংয়ের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার প্রচেষ্টা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। গত এপ্রিল থেকে তিনি ভারত, চীন, রাশিয়া ও বেলারুশ সফর করেছেন। প্রতিটি সফরে তার সরকারকে স্থিতিশীল ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও তার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত সপ্তাহে জানিয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন তার সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে। আলোচনার অন্যতম বিষয় মিয়ানমারে পরিচালিত প্রতারণাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা। এসব কেন্দ্র থেকে প্রতারণার মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে কয়েক শ কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক দমন-পীড়নের ঘটনায় মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ওই অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। যুক্তরাষ্ট্র ওই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছিল।
ইয়াঙ্গুনের তাম্পাদিপা ইনস্টিটিউটের পরিচালক খিন জাও উইন বলেন, চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের সমন্বিত উদ্যোগ মিন অং হ্লাইংয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিচ্ছে। তিনটি দেশের সঙ্গেই মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে। গৃহযুদ্ধের প্রভাবও তাদের ওপর পড়েছে। সীমান্তের কাছে সংঘর্ষ, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং শরণার্থীদের প্রবেশ—এসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।
খিন জাও উইনের মতে, মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি স্বার্থ রয়েছে এই তিন প্রতিবেশী দেশের। তাই তারা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারকে স্বীকৃতি দিতে আগ্রহী।
তার ভাষায়, এ ক্ষেত্রে সবারই নিজস্ব সুবিধা ও স্বার্থ কাজ করছে।
সংঘাত থামেনি, বাড়ছে হামলা
কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও মিয়ানমারের সংঘাত থামেনি। মিন অং হ্লাইং সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় লড়াই চলছে। বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছ থেকে হারানো এলাকা পুনর্দখলে অভিযান চালাচ্ছে সামরিক বাহিনী। রাখাইন, চিন, কাচিন ও কারেন রাজ্য এবং সাগাইং অঞ্চলে এসব অভিযান চলছে।
বিমান হামলা জোরদার করার পাশাপাশি সেনা নিয়োগও বাড়িয়েছে জান্তা সরকার। এতে তাদের বাহিনীতে আরো কয়েক দশ হাজার সদস্য যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, চীনও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করেছে।
তবে সাবেক ডাচ কূটনীতিক লেটিশিয়া ভ্যান ডেন আসুম মনে করেন, সামরিক বাহিনীর পক্ষে পুরো মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া কঠিন।
তার মতে, এর জন্য শুধু নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সেনাঘাঁটি রেখে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলে চলবে না; পুরো দেশ দখলে রাখতে বিপুলসংখ্যক সেনার প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, এ কারণেই মিন অং হ্লাইং দেশের কিছু এলাকায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির ওপর নির্ভর করছেন। এতে অন্য এলাকায় লড়াই চালানোর জন্য সেনা সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আসিয়ান দেশগুলোর উদ্যোগকে বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেন ভ্যান ডেন আসুম। তার মতে, যার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ রয়েছে, তার কাছেই তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।
মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। ফলে তাদের নাগরিক হিসেবে দেশে ফিরিয়ে নিতে দেশটি আদৌ রাজি হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি। রোহিঙ্গাদের আদি নিবাস এই রাজ্যের বড় অংশ এখন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রত্যাবাসন করা হলেও রোহিঙ্গাদের কোথায় রাখা হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ভ্যান ডেন আসুম এ পরিস্থিতিকে ‘অন্ধের সঙ্গে অন্ধের কথা বলা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
প্রতীকী পদক্ষেপে কি বদল আসবে?
মিন অং হ্লাইং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আরো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। গত আগস্টে থাইল্যান্ড সফরের আগে তিনি আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটিকে (আইসিআরসি) ক্ষমতাচ্যুত বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেন। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে ৮১ বছর বয়সি নোবেলজয়ী এই নেত্রীকে কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছিল। ৩ আগস্ট আইসিআরসির প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে দেখা করেন। এতে বহু বছর পর সু চির প্রথম ছবি প্রকাশ্যে আসে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সাই কিয়ি জিন সো এই পদক্ষেপকে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবর্তনের বদলে কম খরচে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ওই সাক্ষাৎ থেকে শুধু নিশ্চিত হওয়া গেছে যে অং সান সু চি বেঁচে আছেন। এর বেশি কিছু নয়।
তিনি বলেন, আসিয়ান নেতারা মিন অং হ্লাইংকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিলেও সামরিক বাহিনীর বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ২৮ সেপ্টেম্বর রাখাইন রাজ্যের একটি বাজারে হামলার কথা উল্লেখ করেন। ওই হামলায় আনুমানিক ৫০ জন নিহত হন।
সাই কিয়ি জিন সো বলেন, হামলা অব্যাহত থাকাই প্রমাণ করে যে নমনীয় কূটনীতি সামরিক বাহিনীকে সহিংসতা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
বিদেশি সফরের মাধ্যমে পাওয়া স্বীকৃতি সামরিক বাহিনীকে আরো বেপরোয়া করে তুলতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, কার্যকর প্রতিরোধের অভাব, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে দুর্বলতা, আসিয়ানের পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়ার উদ্যোগ এবং চীন ও রাশিয়ার মাধ্যমে অস্ত্র ও জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ—সব মিলিয়ে সামরিক বাহিনীর সামনে সংঘাত বাড়িয়ে যাওয়ার প্রণোদনা রয়েছে। বিশেষ করে সাগাইং ও রাখাইনের মতো বিতর্কিত এলাকায়, যেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, সেখানে হামলা আরো বাড়তে পারে।
আসিয়ানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মিয়ানমার সংকট মোকাবিলায় আসিয়ানের বর্তমান সভাপতি ফিলিপাইন ও পরবর্তী সভাপতি সিঙ্গাপুরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এশিয়া হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার অ্যাডভোকেটসের পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে পুরোপুরি আসিয়ানের বলয়ে ফিরিয়ে আনার যে চাপ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে এই দুই দেশকে। একই সঙ্গে জোটের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
রবার্টসন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বিমান চলাচলের জ্বালানি সরবরাহে নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। মিয়ানমার সংকটের পুরো দায় আঞ্চলিক জোটের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। এ জন্য বিভিন্ন দেশের আদালতে সর্বজনীন এখতিয়ারের আওতায় মামলা বাড়ানো যেতে পারে। অথবা মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা শহরের ফুটপাত থেকে উচ্ছেদের পর, স্বল্প আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী এবং চাকরিজীবীরা চিন্তায় পড়েছেন। কারণ, কম দামে জামা, প্যান্ট, টি-শার্ট কিংবা শিশুদের পোশাক কেনার জন্য ফুটপাত ছিল অনেকের প্রথম পছন্দ। যেখানে শপিং মলে একটি পোশাকের দাম কয়েক হাজার টাকা, সেখানে ফুটপাত থেকে কখনো কয়েক শ টাকাতেই পছন্দের পোশাক পাওয়া যেত।
তবে সাশ্রয়ী দামে পোশাক কেনার জন্য এখন হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হকার্স মার্কেট, অস্থায়ী দোকান এবং স্বল্পমূল্যের পোশাকের বাজার রয়েছে। এসব স্থানে তুলনামূলক কম দামে দেশি পোশাক, আমদানি করা পোশাক, স্টক লট এবং কখনো বিদেশি ব্র্যান্ডের উদ্বৃত্ত পণ্যও পাওয়া যায়। তবে সব পণ্য আসল ব্র্যান্ডের হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
চলুন, ঢাকার কয়েকটি পরিচিত সাশ্রয়ী পোশাকের বাজারের ঠিকানা, কেনাকাটার ধরন এবং যাওয়ার আগে যেসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি তা জেনে নেওয়া যাক।
ঢাকার সাশ্রয়ী পোশাকের ৭টি বাজার
১. গাউছিয়া মার্কেট
ঠিকানা: ৩, গাউছিয়া মার্কেট, মিরপুর রোড, নিউমার্কেট এলাকা, ঢাকা-১২০৫।
বিশেষত্ব: নারীদের থ্রি-পিস, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কাপড় এবং ফ্যাশন সামগ্রী কেনার জন্য পরিচিত। আশপাশের দোকানগুলোতেও দরদাম করে সাশ্রয়ী পোশাক খুঁজে পাওয়া যায়।
সাপ্তাহিক বন্ধ: সাধারণত মঙ্গলবার। বুধবার কিছু সময়সূচির ভিন্নতা থাকতে পারে। যাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।
২. চাঁদনী চক মার্কেট
ঠিকানা: মিরপুর রোড, নিউমার্কেটের বিপরীতে, ঢাকা-১২০৫।
বিশেষত্ব: পার্টি ড্রেস, থ্রি-পিস, শাড়ি, কাপড় এবং নারীদের ফ্যাশন সামগ্রীর জন্য জনপ্রিয়। বাজেটের মধ্যে পছন্দের পোশাক খুঁজতে একাধিক দোকান ঘুরে দেখা ভালো।
সাপ্তাহিক বন্ধ: সাধারণত মঙ্গলবার।
৩. নিউমার্কেট
ঠিকানা: মিরপুর রোড, ঢাকা-১২০৫।
বিশেষত্ব: পুরুষ, নারী এবং শিশুদের পোশাক, টি-শার্ট, প্যান্ট, শার্ট এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জামাকাপড়ের জন্য ভালো বিকল্প। মার্কেটের ভেতরের দোকানের পাশাপাশি আশপাশের সাশ্রয়ী পোশাকের দোকানও দেখতে পারেন।
সাপ্তাহিক বন্ধ: সাধারণত মঙ্গলবার।
৪. নূরজাহান সুপার মার্কেট
ঠিকানা: ঢাকা কলেজের বিপরীতে, মিরপুর রোড, নিউমার্কেট এলাকা, ঢাকা-১২০৫।
বিশেষত্ব: পুরুষদের শার্ট, প্যান্ট, পোলো টি-শার্ট এবং তুলনামূলক কম দামের রেডিমেড পোশাক খুঁজতে পারেন এখানে। পছন্দের মাপ ও কাপড়ের মান যাচাই করে কেনা উচিত।
খোলার দিন: মঙ্গলবার ছাড়া সাধারণত সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে খোলা থাকে।
৫. বঙ্গবাজার
ঠিকানা: ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান, ঢাকা।
বিশেষত্ব: রেডিমেড পোশাক এবং তুলনামূলক কম দামের জামাকাপড়ের জন্য পরিচিত এই বাজার। পাইকারি ও খুচরা কেনাকাটার সুযোগ দোকানভেদে আলাদা। বাজারের বিভিন্ন অংশের কার্যক্রম এবং দোকানের অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে।
খোলার দিন: দোকানভেদে সময়সূচি ভিন্ন হতে পারে; যাওয়ার আগে বর্তমান অবস্থা জেনে নিন।
৬. ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট
ঠিকানা: মিরপুর রোড, নিউমার্কেট-ধানমন্ডি সংলগ্ন এলাকা, ঢাকা-১২০৫।
বিশেষত্ব: শাড়ি, থ্রি-পিস, কাপড় এবং বিভিন্ন ধরনের পোশাকের জন্য পরিচিত। ফুটপাতের মতো কম বাজেটে কেনাকাটার বিকল্প খুঁজতে চাইলে বাজারটি ঘুরে দেখতে পারেন।
খোলার দিন: নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ সাপ্তাহিক বন্ধের তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।
৭. মৌচাক মার্কেট
ঠিকানা: মৌচাক মোড়, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭।
বিশেষত্ব: শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক এবং অন্যান্য রেডিমেড জামাকাপড়ের জন্য দেখতে পারেন। নিউমার্কেট এলাকায় যেতে অসুবিধা হলে এটি একটি বিকল্প।
খোলার দিন: সাধারণত শুক্রবারসহ সপ্তাহের বেশির ভাগ দিন খোলা থাকে; সাপ্তাহিক বন্ধ এবং দোকানের সময়সূচি আগে যাচাই করুন।
ফুটপাতের দামে পোশাক কেনার জন্য যে কৌশলগুলো কাজে দেবে:
দরদাম ও তুলনা করুন: একই পোশাকের দাম অন্তত তিনটি দোকানে জেনে নিন। প্রথম দোকানেই কেনাকাটা চূড়ান্ত করবেন না। বিশেষ করে টি-শার্ট, শার্ট, প্যান্ট এবং শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রে একই নকশার পণ্যের দাম ও মানে পার্থক্য থাকতে পারে।
মান যাচাই করুন: কম দাম মানেই ভালো সাশ্রয় নয়। কাপড়ের সেলাই, বোতাম, চেইন, দাগ, রং এবং সাইজ পরীক্ষা করুন। শিশুদের পোশাক কিনলে আরামদায়ক কাপড় ও সঠিক মাপকে গুরুত্ব দিন।
পাইকারি সুবিধা নিন: বেশি পোশাক কিনলে দরদাম করুন। একসঙ্গে একাধিক পণ্য কিনলে কিছু দোকানে দাম কমানোর সুযোগ থাকে। তবে পাইকারি দাম পেতে ন্যূনতম কতটি পোশাক নিতে হবে, তা আগে জেনে নিন।
সময়সূচি জেনে নিন: মার্কেটে যাওয়ার আগে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন যাচাই করুন। ঢাকার অনেক মার্কেটের প্রচলিত বন্ধের দিন মঙ্গলবার হলেও সব বাজার ও দোকানের সময়সূচি এক নয়। উৎসব, সরকারি নির্দেশনা কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে সময় পরিবর্তিত হতে পারে। ২০২৬ সালে ঢাকায় হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসন ও বাজার পরিচালনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তাই ফুটপাতের দোকানের পরিবর্তে নির্দিষ্ট বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করাই বেশি সুবিধাজনক হতে পারে।
ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ হওয়ার পর কম আয়ের ক্রেতাদের জন্য সাশ্রয়ী পোশাক কেনার বিকল্প খোঁজা স্বাভাবিক। তবে ঢাকার গাউছিয়া, চাঁদনী চক, নিউমার্কেট, নূরজাহান সুপার মার্কেট, বঙ্গবাজার, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট এবং মৌচাকের মতো বাজারে খোঁজ করলে বাজেটের মধ্যে পছন্দের পোশাক পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সঠিক বাজার নির্বাচন, দরদাম এবং মান যাচাই—এই তিনটি বিষয় মাথায় রাখলেই কেনাকাটায় খরচ কমানো সম্ভব।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চীনের পর বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা এবং এর বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞ সহায়তা ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে নেদারল্যান্ডস সরকারের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, এমনটি জানানো হয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির একটি প্রতিবেদনে।
মঙ্গলবার (ঢাকা) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী সিওয়ার্ড সিওয়ার্ডসমার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেসসচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন এই তথ্য জানান।
বৈঠকে তারেক রহমান মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ এবং নেদারল্যান্ডস—দুই দেশই বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তিনি বিশেষ করে ভূমি পুনরুদ্ধারে নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন।
ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, সিওয়ার্ডসমা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ভূমি পুনরুদ্ধার, উন্নয়ন এবং জলবায়ু-সহনশীল নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানো এবং সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
এই অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও, তিস্তা প্রকল্পটিকে পূর্বে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার একটি ক্ষেত্র হিসেবে আলোচনা করা হয়েছিল।
তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীনের সম্পৃক্ততা ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের (চিকেনস নেক) ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে প্রকল্পটি ভারতের নজরে রয়েছে। এই অঞ্চলে বাইরের কোনো শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি, বিশেষত চীনের উপস্থিতি, ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে সংযুক্তকারী এই করিডরের কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সহযোগিতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদের পরিকল্পনা, জলপ্রবাহের পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ ও দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো গভীর করতে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীন তার সামর্থ্যের মধ্যে বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে। পাশাপাশি প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ভারতের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে নয়।
ঢাকার বক্তব্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরে নদী পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন।
চীনের পাশাপাশি তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আলোচনা করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জানিয়েছে, চীনের এই সহায়তা পেলে এ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী সিওয়ার্ড সিওয়ার্ডসমা মন্তব্য করেন, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার করার জন্য বর্তমান সময়টি উপযুক্ত। বিশেষ করে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
জুমার দিন সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহ তাআলা এই দিনকে অন্যান্য দিনের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন। ফলে, এই দিনে মুমিনদের হৃদয়ে এক অপার্থিব সুখের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। পারস্পরিক সৌহার্দ ও ভালোবাসার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ে। মহানবী (সা.)-এর জীবনে পাওয়া বিশেষ কিছু আমল ও ইবাদত রয়েছে, যা এই দিন পালন করা উচিত। নিম্নে সেগুলোর আলোচনা করা হলো—
১. জুমাবারের ফজরের তিলাওয়াত করা: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) শুক্রবার ফজরের নামাজে সুরা আস-সিজদা এবং সুরা আল-ইনসান তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৬৮)
জুমার দিনে এই সুরাগুলো তিলাওয়াত করার কারণ হলো, এতে আদম (আ.)-এর সৃষ্টির কথা, পুনরুত্থানের বিষয় এবং কিয়ামতের দিন সমবেত হওয়ার আলোচনা রয়েছে। তাই এই সুরা পাঠ করে উম্মতকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
২. বেশি পরিমাণে দরুদ শরিফ পড়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা জুমার দিন আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কেননা তোমাদের পাঠকৃত দরুদ আমার সামনে পেশ করা হয়।" (আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
৩. জুমার নামাজ আদায় করা: ইসলামের ফরজ বিধানগুলোর মধ্যে জুমার নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। আরাফার দিবসের পর এদিন সবচেয়ে বেশি মানুষ একত্রিত হয়। যারা জুমার নামাজকে তুচ্ছ মনে করে ছেড়ে দেয়, তাদের হৃদয়ে আল্লাহ তাআলা মোহর মেরে দেন।
৪. গোসল করা: এই দিনে বিশেষভাবে গোসল করার তাগিদ এসেছে। সালিম (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, "যে ব্যক্তি জুমার নামাজে আসে সে যেন গোসল করে আসে।" (তিরমিজি, হাদিস: ৪৯২)
৫. সুগন্ধি ব্যবহার করা: অন্য দিনের তুলনায় এদিন সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, "আমি এ মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, জুমার দিন সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮০)
৬. দ্রুত মসজিদে যাওয়া: জুমার দিনের ফজিলত লাভের জন্য এই আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এদিকে বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া উচিত।
৭. ইবাদতে মশগুল থাকা: ইমাম জুমার নামাজে আসার পূর্ব পর্যন্ত নামাজ, জিকির ও তিলাওয়াতে রত থাকা।
৮. খুতবার সময় সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকা: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি জুমার দিন ইমামের খুতবা দেওয়ার সময় তার সঙ্গীকে বলল, ‘চুপ থাকো’ সে একটি অনর্থক কাজ করল।" (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৪০১)
৯. সুরা কাহফ পড়া: আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তীকাল জ্যোতির্ময় হবে।" (আত-তারগিব, হাদিস: ৭৩৫)
১০. জুমার নামাজের নির্ধারিত সুরা পাঠ করা: নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই ঈদের নামাজে ও জুমার নামাজে ‘সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা’ ও ‘হাল আতা-কা হাদিসুল গা-শিয়াহ’ সুরা দুটি পাঠ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯১৩)
কিছু বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) সুরা জুমুআ ও সুরা আলা তিলাওয়াত করতেন।
১১. পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর কাপড় পরিধান করা: আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, "যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে, উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, তার উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে এবং আল্লাহ তার পরিবারের জন্য যে সুগন্ধির ব্যবস্থা করেছেন, তা শরীরে লাগায়, এরপর জুমার সালাতে এসে অনর্থক আচরণ না করে এবং দুজনের মাঝে ফাঁক করে অগ্রসর না হয়, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ ক্ষমা করা হয়।" (সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস: ১০৯৭)
১২. সুগন্ধি লাগানো: ওমর (রা.) জুমার দিন দ্বিপ্রহরে সুগন্ধি লাগানোর জন্য আদেশ করেছেন।
১৩. ক্ষমা প্রার্থনা করা: এই দিনে মহান রবের পক্ষ থেকে গুনাহ মাফের বারি বর্ষিত হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, "যদি কোনো মুসলিম পবিত্র হয়ে জামে মসজিদের দিকে হাঁটতে থাকে, এরপর ইমাম নামাজ শেষ করা পর্যন্ত নীরব থাকে, তাহলে এ নামাজ এই জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত তার গুনাহের কাফফারা (মোচনকারী) হয়ে যাবে, যদি ধ্বংসকারী তথা কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৩৭২৯)
১৪. মৃতদের জন্য দোয়া করা: জুমার দিন কবরের আজাব মাফ হয়ে যায়। আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) জুমার দিন ছাড়া (অন্য দিন) ঠিক দুপুরে নামাজ আদায় করা অপছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন, "জুমার দিন ছাড়া (অন্যান্য দিনে) জাহান্নামের আগুনকে উত্তপ্ত করা হয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৮৩)
জুমার দিনে বা রাতে যে মারা যাবে, তার জন্য কবরের আজাব উঠিয়ে নেওয়া হবে, এটি এই হাদিস থেকে প্রমাণিত। তবে কিয়ামত পর্যন্ত আজাব দেওয়া হবে না, এ বিষয়ে নিশ্চিত নয়।
১৫. বেশি বেশি দোয়া করা: বিশেষ সময়ে দোয়া কবুল হয়। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, "জুমার দিনের মধ্যে অবশ্যই এমন একটি মুহূর্ত আছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করে নিশ্চয়ই তিনি তাকে তা দান করেন।" তিনি বলেন, "সে মুহূর্তটি অতি স্বল্প।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৫৮)
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে, সে সময়টি আসরের পর থেকে নিয়ে মাগরিবের আগ মুহূর্ত। (জাদুল মাআদ থেকে সংক্ষেপিত)
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্দুক হামলার ঘটনায় তিন শিশুসহ মোট চারজন নিহত হয়েছেন। নিহত শিশুদের বয়স ৫, ৮ ও ১১ বছর। হামলায় একজন শিক্ষকও মারা গেছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন সাত বছর বয়সি এক শিশু এবং ৫৪ বছর বয়সি আরেক শিক্ষক। তাদের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার, বেন্ড শহরের সিলভার রেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে। শহরটি পোর্টল্যান্ডের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।
বেন্ড পুলিশের প্রধান মাইক ক্রান্টজ বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, হামলাকারী ১৬ বছর বয়সি এক কিশোর। সে বেন্ড শহরের বাসিন্দা। হামলার পর ওই কিশোরও নিহত হয়েছে, তবে তার পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরে ক্রান্টজ বলেন, হামলাকারী তালাবদ্ধ দরজায় গুলি চালিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, হামলাকারী আগে কখনো ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল কি না।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৫৯ মিনিটে জরুরি সেবাদাতা সংস্থাগুলোর কাছে প্রথম সাহায্যের ফোন আসে। পরবর্তী কয়েক মিনিটে আরো কয়েকবার ফোন আসে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ফোনটি করেছিলেন একটি গাড়িতে থাকা একজন ব্যক্তি। তিনি জানান, লম্বা আগ্নেয়াস্ত্রধারী একজন তাকে লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি চালিয়েছেন।
দুপুর ১টা ১ মিনিটে বিদ্যালয়টি অবরুদ্ধ করা হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
ক্রান্টজ জানান, অল্প সময়ের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তা খবর দেন, বিদ্যালয়ে ঢোকা হামলাকারীকে একজন স্থানীয় ব্যক্তি গুলি করেছেন। ওই ব্যক্তি হামলাকারীকে বিদ্যালয়ে ঢুকতে দেখে তার পিছু নেন এবং ভেতরে গিয়ে তার মুখোমুখি হন।
পুলিশ সদস্যরা ভবনে ঢুকে হামলাকারীকে মৃত অবস্থায় পান। এরপর তারা বিদ্যালয়ের সব কক্ষ তল্লাশি করেন, যাতে সেখানে আর কোনো হুমকি না থাকে। পরে আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরো তথ্য প্রকাশ করা হবে।
হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি কক্ষ তল্লাশি করে শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নিরাপদে বের করে আনা হয়। পরে বাসে করে তাদের কাছের একটি গির্জায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বজনদের সঙ্গে তাদের পুনর্মিলনের ব্যবস্থা করা হয়।
বেন্ড পুলিশ বিভাগের যোগাযোগ ব্যবস্থাপক শিলা মিলার বৃহস্পতিবার বলেন, বেন্ড শহরে এমন ঘটনা কেউ দেখতে চান না। এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করতে সংস্থাটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে রয়েছেন। তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
ওরেগনের গভর্নর টিনা কোটেক শোকাহত মানুষের পাশে দাঁড়াতে অঙ্গরাজ্যবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ ক্ষতিতে সব ওরেগনবাসী শোকাহত। দিনটি অত্যন্ত ভয়াবহ। কোনো মা-বাবার এমন দিনের মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়। কোনো সম্প্রদায়েরও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা নয়।
হামলাকারীকে থামাতে এগিয়ে আসা স্থানীয় ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করেন গভর্নর। তিনি বলেন, আরো প্রাণহানি ঠেকাতে ওই ব্যক্তি সাহসিকতার সঙ্গে হস্তক্ষেপ করেছেন। এ ঘটনার কারণে তার ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ওরেগনের প্রতিনিধিত্বকারী জেফ মার্কলিও শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বেন্ডের বাসিন্দা, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের প্রতি তার সমবেদনা রয়েছে। বিদ্যালয়ে সহিংসতার আশঙ্কা নিয়ে কারো দিন কাটানো উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। দেশটিতে বন্দুক হামলার ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা গান ভায়োলেন্স আর্কাইভের হিসাবে, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ৩৬৯টি বড় ধরনের বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো ঘটনায় হামলাকারীকে বাদ দিয়ে অন্তত চারজন আহত বা নিহত হলে সেটিকে এ ধরনের হামলা হিসেবে গণ্য করা হয়।
বন্দুক সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা সংগঠন এভরিটাউন ফর গান সেফটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল প্রাঙ্গণে প্রায় ১০০টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২৭ জন।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ