প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মরণবাঁধ ফারাক্কার প্রভাবে সৃষ্ট উঁচু চর বর্তমানে কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পদ্মাপাড়ের রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন নদীর বুকে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে, যেখানে সূর্যমুখী, টমেটো, বেগুন, ভুট্টা, চিনাবাদাম, কাউন, পটল, করলা, সরিষা, রাই, চিনা, কলমি, শসা, খিরা, শাক ও হরেক রকমের সবজি চাষ করা হচ্ছে। এই ফসলগুলো বর্তমানে এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসল হয়ে উঠেছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চর এলাকার আবহাওয়া ও জলবায়ু ফসল চাষের জন্য বেশ উপযোগী।
চরাঞ্চলের হাজারো কৃষক এই সোনালী ফসলের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। প্রতিটি চরেই ফলন ভালো হওয়ায় তারা অত্যন্ত দামি এসব শস্য নিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখছেন। সঠিক দিকনির্দেশনা, পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ পেলে চরাঞ্চলে চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে এবং এসব শস্য চরাঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। নদীর পলিমাটি অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় কোনো সার ছাড়া কিংবা সামান্য সারে অনেক বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোস্তেফা কামাল হোসেন ও চরআষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে প্রমত্ত পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও যমুনা নদী। প্রতিবছর এসব নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হয় বসতবাড়িসহ হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি। নদী তীরবর্তী মানুষ নদীভাঙন ও বন্যার কারণে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। তবে একদিকে তীব্র স্রোতে প্রতিবছর উজান থেকে পলি মাটি জমে নদীর ভাটি অঞ্চল ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে নদীর বুক চিরে অসংখ্য চর জেগে উঠছে। পলিমিশ্রিত এসব চর রবিশস্যের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় নদীপাড়ের মানুষ এই চরগুলোকে ঘিরেই নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন।
এছাড়া মরণবাঁধ ফারাক্কারের কারণে গত ৫০ বছরে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে বালুচরের উচ্চতা প্রায় ১৮ মিটার বেড়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে তিন মাস পানি থাকলেও বছরের বাকি ৯ মাস পানি তলানিতে ঠেকে। প্রমত্ত পদ্মা ও মহানন্দা নদী এখন মরা খালের রূপ ধারণ করেছে। পদ্মা শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এর শাখা-প্রশাখা নদ-নদী-বড়াল, মরা বড়াল, মুছাখান, ইছামতী, ধলাই, হুড়াসাগর, চিকনাই, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতা, কালিকুমার, হরিহর, কালিগঙ্গা, কাজল, হিসনা, সাগরখালি, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বেলাবতসহ প্রায় ২৫টি নদ-নদীর অস্তিত্ব এখন বিলীন কিংবা বিলুপ্তির পথে।
ফারাক্কা ছাড়াও ভারত বেশ কয়েকটি নদীতে বাঁধ নির্মাণ করেছে। এর মধ্যে তিস্তা, মহানন্দা, করতোয়া, আত্রাই ও ধরলা নদী উল্লেখযোগ্য। এসব নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলে মূল নদীসহ এদের শাখা-উপশাখাগুলোও অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। নদীগুলো মরে গেলেও জেগে ওঠা এসব চরে নতুন আশার আলো দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা।
বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন চর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মার বুক চিরে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। পলিমিশ্রিত উর্বর মাটির এসব চর এখন সবুজের সমারোহে ভরে গেছে। চরে চাষ করা হচ্ছে ফুলকপি, ওলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, পটল, করলা, লালমি, শসা, খিরা, ভুট্টা, ধনে, চিনাবাদাম, কাউন, মিষ্টি আলু ও মিষ্টি কুমড়াসহ নানা জাতের শাকসবজি ও রবিশস্য।
চরাঞ্চলের একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাদাম ও কাউন চাষ অত্যন্ত সহজ, খরচ কম এবং ঝামেলামুক্ত। তিস্তার চরগুলোতে বন্যার পলিমাটি জমা হওয়ায় তা বাদাম, কাউন, তরমুজ, মিষ্টি কুমড়াসহ অন্যান্য রবিশস্যের জন্য বেশ উপযোগী। ফলন ভালো এবং লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা এখন এসব শস্য চাষে বেশি ঝুঁকছেন। কৃষকরা জানান, সরকারি কৃষি বিভাগ থেকে যদি প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হয়, তবে উত্তরাঞ্চলের চরাঞ্চলগুলো দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার মরিয়ম আহম্মেদ বলেন, উপজেলার পদ্মার জেগে ওঠা চরাঞ্চল কৃষির জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। নতুন জেগে ওঠা এসব চরের পলি ও বেলে-দোআঁশ মাটি ফসল চাষের জন্য ভীষণ উপযোগী। ইতোমধ্যে চরাঞ্চলে চিনাবাদাম, পটল, করলা, ভুট্টা, বেগুন, মসুর, কলাই, মটর, ঝিঙাসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হচ্ছে। সঠিক প্রযুক্তি ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এখানে আরও বহুমুখী ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, চরাঞ্চলে মাটির ধরন ও মৌসুম বিবেচনায় চিনাবাদাম, ভুট্টা, মসুর, খেসারি, মুগ, কলাই, মটর, তিল, সূর্যমুখী ও বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ সম্ভব। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে।
চরাঞ্চলের কৃষি স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় বাজারের প্রসার এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখবে। পতিত ও অনাবাদি চরজমি উৎপাদনের আওতায় আনা গেলে দেশের মোট কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে। তবে চরাঞ্চলের কৃষিকে টেকসই করতে কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, মাটির বৈশিষ্ট্য, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি মোকাবিলা, বীজ সংরক্ষণ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগ-বালাই দমন এবং ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর শুধু চরাঞ্চলেই ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে টমেটো, সরিষা, কলাই, পটল, করলা, ভুট্টা, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, চিনা ও মসুরসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়েছিল এবং কৃষকরা ভালো ফলন পেয়েছিলেন। চলতি মৌসুমে ফসল চাষের পরিধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বেলে-দোআঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে তেলজাতীয় ফসল (সরিষা, রাই, তিল) ভালো হওয়ায় চরাঞ্চলে এগুলোর চাষ জোরদার করা সম্ভব হচ্ছে।
চরে চাষাবাদ সম্পর্কে কৃষক জোহরুল ইসলাম ও মনিরুল জানান, তারা মৌসুমের শুরুতেই টমেটো, বেগুন ও চিনাবাদাম চাষের প্রস্তুতি নিয়েছেন। সবজি ক্ষেত পরিচর্যারত কৃষক আব্দুল হাকিম জানান, গত বছর তিনি ৪ বিঘা জমিতে টমেটো, বেগুন, ভুট্টা ও বাদাম চাষ করে ভালো দাম ও ফলন পেয়েছিলেন। তাই অল্প পরিশ্রমে ও কম খরচে ভালো লাভ হওয়ায় এবার তিনি দ্বিগুণ জমিতে চাষাবাদ করবেন।
কৃষকদের দাবি- চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার চাষীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দিলে তারা চাষাবাদে আরও বেশি আগ্রহী হবেন। এতে চরবাসীর জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন